
আন্তর্জাতিক ডেস্ক:: ন্যায়বিচারের আশায় দ্বারে দ্বারে ঘুরেও শেষ পর্যন্ত চরম নির্মমতার শিকার হতে হলো এক অসহায় মুসলিম নারীকে। রমজানের পবিত্র মাসে রোজা রেখে শান্তিপূর্ণ সমাধানের আশায় স্থানীয় গ্রাম প্রধানের কাছে গিয়েছিলেন রওশন খাতুন। কিন্তু সেখান থেকেই তাকে ফিরতে হয়েছে অমানবিক নির্যাতনের শিকার হয়ে মৃত্যুর কোলে।
একবিন্দু পানি চাওয়ার বদলে তাকে চরম অপমানজনক আচরণের মুখোমুখি হতে হয়। এই ঘটনা শুধু একটি পরিবারের স্বপ্ন ভেঙে দেয়নি, বরং মানবিকতা ও ন্যায়বিচারের প্রশ্নও তুলেছে।
ঘটনাটি ঘটেছে ভারতের বিহার রাজ্যের মধুবনী জেলার ঘোগারডিহা ব্লকের আমহি গ্রামে। গুরুতর আহত হওয়ার পর চিকিৎসাধীন অবস্থায় গত ১ মার্চ মারা যান রওশন খাতুন। এর আগে ২৮ ফেব্রুয়ারি হামলার ঘটনায় তাকে পটনা মেডিকেল কলেজ ও হাসপাতালে ভর্তি করা হয়েছিল।
স্থানীয় সূত্রে জানা গেছে, স্বামীর সঙ্গে জড়িত একটি বিরোধ নিষ্পত্তির আশায় রওশন খাতুন স্থানীয় গ্রাম প্রধান কুমারী দেবীর কাছে যান। কিন্তু অভিযোগ রয়েছে, সেখানে সাহায্য পাওয়ার বদলে গ্রাম প্রধানের ছেলে মনু সিং ও তার পরিবারের সদস্যদের নেতৃত্বে একদল লোক তার ওপর হামলা চালায়।
প্রত্যক্ষদর্শীরা জানান, হামলাকারীরা রওশন খাতুনকে একটি খুঁটির সঙ্গে বেঁধে বেধড়ক মারধর করে। তিনি বারবার তাদের থামার অনুরোধ করলেও নির্যাতন চলতে থাকে।
একজন প্রত্যক্ষদর্শী বলেন, “তিনি ন্যায়বিচারের আশায় সেখানে গিয়েছিলেন। কিন্তু অভিযোগ শোনার বদলে কয়েকজন তাকে মারধর শুরু করে। পুরো ঘটনাটি অত্যন্ত মর্মান্তিক।”
আরেকজন স্থানীয় বাসিন্দা বলেন, “সবাই দেখছিল কী ঘটছে, কিন্তু কেউ থামাতে পারেনি। তিনি অসহায়ভাবে বারবার তাদের থামার অনুরোধ করছিলেন।”
স্থানীয় ডিজিটাল প্রকাশনা ‘মিথিলা সমাচার’ ও প্রত্যক্ষদর্শীদের বরাতে জানা যায়, হামলার সময় রওশন খাতুন রমজানের রোজা পালন করছিলেন। তিনি পানি চাইলে তাকে জোর করে মদ ও প্রস্রাব মিশ্রিত পানীয় পান করানো হয় বলে অভিযোগ উঠেছে। তবে পুলিশ জানিয়েছে, এই অভিযোগের বিষয়টি এখনও যাচাই করা হচ্ছে।
তদন্তকারী দলের এক পুলিশ কর্মকর্তা বলেন, “ভুক্তভোগীর রোজা রাখা এবং পানি চাওয়ার বিষয়ে কিছু তথ্য আমরা পেয়েছি। তবে এই মুহূর্তে নিশ্চিতভাবে কিছু বলা যাচ্ছে না। বিষয়টি তদন্ত করে দেখা হচ্ছে।”
রওশন খাতুনের স্বামী ঘটনার সঙ্গে জড়িতদের সর্বোচ্চ শাস্তি, অর্থাৎ মৃত্যুদণ্ড দাবি করেছেন। এদিকে মনসুরি সম্প্রদায়ের রাজ্য সভাপতি অজয় মনসুরি জানিয়েছেন, তারা ন্যায়বিচারের দাবিতে শেষ পর্যন্ত লড়াই চালিয়ে যাবেন। তিনি বলেন, “আমরা চাই দোষীদের দৃষ্টান্তমূলক শাস্তি হোক।”
ঘটনার পর পুলিশ একটি এফআইআর দায়ের করে তদন্ত শুরু করেছে। ইতোমধ্যে গ্রাম প্রধানের ছেলেকে আটক করে জিজ্ঞাসাবাদ করা হচ্ছে। পুলিশ জানিয়েছে, ঘটনার সময় উপস্থিত ব্যক্তিদের শনাক্ত করার কাজ চলছে।
একজন পুলিশ কর্মকর্তা বলেন, “আমরা গ্রাম প্রধানের ছেলেকে আটক করেছি এবং তাকে জিজ্ঞাসাবাদ করা হচ্ছে। ঘটনায় জড়িতদের শনাক্ত করা হচ্ছে। দোষী প্রমাণিত হলে তাদের বিরুদ্ধে কঠোর আইনগত ব্যবস্থা নেওয়া হবে।”
এদিকে পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণে রাখতে গ্রামে অতিরিক্ত নিরাপত্তা জোরদার করা হয়েছে। তদন্তের অগ্রগতির ভিত্তিতে আরও গ্রেপ্তার হতে পারে বলে জানিয়েছে প্রশাসন।
রওশন খাতুনের মৃত্যুর খবর দ্রুত ছড়িয়ে পড়লে মধুবনী জেলাজুড়ে তীব্র ক্ষোভের সৃষ্টি হয়। স্থানীয় বাসিন্দা, সমাজকর্মী এবং বিভিন্ন সম্প্রদায়ের মানুষ এই ঘটনার তীব্র নিন্দা জানিয়েছেন। অনেকেই মনে করছেন, এই ঘটনা গ্রামীণ বিহারে সংখ্যালঘু সম্প্রদায়ের নিরাপত্তা নিয়ে বড় প্রশ্ন তুলে দিয়েছে।
একজন স্থানীয় বাসিন্দা বলেন, “মানুষ গ্রাম প্রধানদের কাছে যায় সমস্যার শান্তিপূর্ণ সমাধানের আশায়। কিন্তু রওশন খাতুনের সঙ্গে যা ঘটেছে তা পুরো এলাকাকে স্তম্ভিত করেছে।”
এলাকার এক প্রবীণ ব্যক্তি বলেন, “রওশন খাতুন একজন গরিব নারী ছিলেন, যিনি সাহায্যের জন্য গিয়েছিলেন। তার মৃত্যু আমাদের গভীরভাবে ব্যথিত করেছে। আমরা তার জন্য ন্যায়বিচার চাই এবং সকল নাগরিকের নিরাপত্তা নিশ্চিত হোক—এটাই আমাদের দাবি।”
Leave a Reply