
ডেস্ক:: অকাল বন্যা আর প্রকৃতির রুদ্ররোষে দেশের হাওরাঞ্চলের কৃষকদের চোখে এখন কেবলই অনিশ্চয়তার জল। সোনালি ফসল ঘরে তোলার আগমুহূর্তে উজান থেকে নেমে আসা পাহাড়ি ঢল আর অতিবৃষ্টিতে প্লাবিত হয়েছে মাইলের পর মাইল ফসলি জমি। এই সংকটাপন্ন মুহূর্তে ক্ষতিগ্রস্ত কৃষকদের পাশে দাঁড়ানোর বলিষ্ঠ প্রতিশ্রুতি দিয়েছেন প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমান।
বুধবার জাতীয় সংসদের অধিবেশনে তিনি ঘোষণা করেছেন, দুর্যোগকবলিত এলাকার প্রকৃত ক্ষতিগ্রস্ত কৃষকদের তালিকাভুক্ত করে আগামী তিন মাস সরকারের পক্ষ থেকে বিশেষ সহায়তা প্রদান করা হবে।
আজ বুধবার জাতীয় সংসদের নিয়মিত অধিবেশনে জরুরি জনগুরুত্বসম্পন্ন বিষয়ের ওপর আলোচনা চলাকালীন সুনামগঞ্জ ৫ আসনের সংসদ সদস্য কলিম উদ্দিন আহমেদ হাওরাঞ্চলের বর্তমান ভয়াবহ চিত্রটি তুলে ধরেন।
তিনি তাঁর বক্তব্যে উল্লেখ করেন, গত কয়েক দিনের টানা বর্ষণ ও পাহাড়ি ঢলে সুনামগঞ্জসহ পার্শ্ববর্তী জেলাগুলোর হাওর তলিয়ে যাচ্ছে। কৃষকেরা আধাপাকা ধান কাটার জন্য জীবনপণ লড়াই করছেন, কিন্তু পানির তীব্রতার কাছে তাঁরা অসহায় হয়ে পড়ছেন। তিনি প্রধানমন্ত্রীর কাছে কৃষকদের এই দুর্গতি নিরসনে দ্রুত হস্তক্ষেপের অনুরোধ জানান।
সাংসদের এই প্রশ্নের জবাবে প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমান অত্যন্ত সংবেদনশীলতার সাথে কৃষকদের বর্তমান দুরবস্থার কথা স্বীকার করেন এবং সরকারের গৃহীত ও ভবিষ্যৎ পরিকল্পনার কথা জানান।
প্রধানমন্ত্রী তাঁর বক্তব্যে জানান, হাওরাঞ্চলের এই আকস্মিক আবহাওয়া পরিবর্তন এবং অতিবৃষ্টির বিষয়ে সরকার আগে থেকেই সজাগ ছিল। তিনি বলেন, কৃষকদের বর্তমান পরিস্থিতি অত্যন্ত উদ্বেগের। তিন দিন আগে আবহাওয়ার বিশেষ প্রতিবেদন হাতে পাওয়ার পর আমি ব্যক্তিগতভাবে তিনটি জেলার স্থানীয় প্রশাসনকে সতর্ক থাকার এবং প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা নেওয়ার নির্দেশনা দিয়েছিলাম।
তিনি আরও জানান, আজ সংসদের অধিবেশন শুরুর আগেই তিনি দুর্যোগ ব্যবস্থাপনা ও ত্রাণ মন্ত্রণালয়ের মন্ত্রীর সাথে জরুরি বৈঠক করেছেন। সিলেট বিভাগ ও ময়মনসিংহের ক্ষতিগ্রস্ত এলাকাগুলোতে সরকারি ত্রাণ তৎপরতা দ্রুত শুরু করার নির্দেশ দেওয়া হয়েছে।
প্রধানমন্ত্রী স্পষ্টভাবে জানিয়েছেন, ঢলের পানিতে যাঁদের ফসল সম্পূর্ণ বা আংশিক নষ্ট হয়েছে, তাঁদের অগ্রাধিকার ভিত্তিতে চিহ্নিত করা হবে। ক্ষতিগ্রস্ত কৃষকদের আগামী তিন মাস মেয়াদী বিশেষ প্যাকেজের আওতায় আনা হবে। এর আওতাভুক্ত এলাকাগুলো হলো সুনামগঞ্জ, সিলেট, হবিগঞ্জ এবং ময়মনসিংহের প্লাবিত অঞ্চলসমূহ।
এই প্যাকেজের আওতায় খাদ্যশস্য বিতরণের পাশাপাশি নগদ অর্থ সহায়তা দেওয়ারও পরিকল্পনা রয়েছে সরকারের, যাতে কৃষকেরা তাদের দৈনন্দিন চাহিদা মেটানোর পাশাপাশি পরবর্তী মৌসুমে আবাদের প্রস্তুতি নিতে পারেন।
প্রধানমন্ত্রী বলেন, যাঁরা ফসল হারিয়ে নিঃস্ব হয়ে পড়েছেন, তাঁদের চিহ্নিত করা হচ্ছে। আমরা চাই না একজন কৃষকও খাদ্যাভাব বা অর্থকষ্টে ভুগুন। সরকার আগামী তিন মাস তাঁদের সকল দায়ভার গ্রহণ করার চেষ্টা করবে।
সম্প্রতি এক বক্তব্যে প্রধানমন্ত্রী জানিয়েছিলেন, সহায়তা দেওয়ার ক্ষেত্রে কোনো অতিরিক্ত টাকা ছাপানো হবে না, বরং বর্তমান বাজেটের সঠিক বণ্টন এবং শৃঙ্খলার মাধ্যমেই এই পরিস্থিতি মোকাবিলা করা হবে। আজকের অধিবেশনেও তিনি সেই শৃঙ্খলার ওপর জোর দেন। তিনি জানান, পারিবারিক কার্ড এবং কৃষি কার্ডের মাধ্যমে এই সহায়তা সরাসরি কৃষকদের হাতে পৌঁছে দেওয়া হবে, যাতে কোনো মধ্যস্বত্বভোগী সুবিধা নিতে না পারে।
প্রধানমন্ত্রী জোর দিয়ে বলেন, বর্তমান সরকার টেকসই কৃষি উন্নয়নে বিশ্বাসী। আকস্মিক কোনো দুর্বিপাকে কৃষকরা যাতে ভেঙে না পড়েন, সেজন্যই এই বিশেষ কার্ড প্রথা চালু করা হয়েছে। এর মাধ্যমে স্বচ্ছতা নিশ্চিত করে প্রকৃত হকদারদের কাছে সাহায্য পৌঁছানো সম্ভব হবে।
হাওরাঞ্চল বাংলাদেশের ভাতের থালা হিসেবে পরিচিত হলেও সাম্প্রতিক বছরগুলোতে জলবায়ু পরিবর্তনের প্রভাবে এপ্রিলের শেষভাগে বা মে মাসের শুরুতে অকাল বন্যা একটি নিয়মিত সমস্যা হয়ে দাঁড়িয়েছে। এ বছরের অতিবৃষ্টি ও উজান থেকে আসা ঢল বিগত কয়েক বছরের রেকর্ড ছাড়িয়ে গেছে।
কৃষি মতে, হাওরের বোরো ফসল রক্ষা করার জন্য স্থায়ী বাঁধ নির্মাণ এবং নদী খনন অপরিহার্য। প্রধানমন্ত্রীও তাঁর বক্তব্যে দীর্ঘমেয়াদী সমাধানের ইঙ্গিত দিয়ে বলেন, কেবল সাময়িক সহায়তা নয়, কৃষকদের সুরক্ষায় খনন এবং অবকাঠামোগত উন্নয়নেও সরকার গুরুত্ব দিচ্ছে।
সংসদে প্রধানমন্ত্রীর এই ঘোষণা ক্ষতিগ্রস্ত কৃষকদের মনে কিছুটা হলেও স্বস্তি ফিরিয়ে এনেছে। যখন মাঠের সোনালি স্বপ্ন পানির নিচে তলিয়ে যাচ্ছে, তখন রাষ্ট্রপ্রধানের এই সংহতি কৃষকদের নতুন করে ঘুরে দাঁড়ানোর সাহস জোগাবে। আগামী কয়েক দিনের মধ্যে জেলা প্রশাসনের মাধ্যমে মাঠ পর্যায়ে ক্ষয়ক্ষতি নিরূপণের কাজ শুরু হবে বলে সংসদ সূত্রে জানা গেছে। হাওরের মানুষের কাছে এই মুহূর্তে সবচেয়ে বড় দাবি হলো দ্রুত বাস্তবায়ন।
সরকার যদি দ্রুততার সাথে প্রকৃত ক্ষতিগ্রস্তদের কাছে এই তিন মাসের সহায়তা পৌঁছে দিতে পারে, তবে হাওরাঞ্চলের অর্থনৈতিক বিপর্যয় অনেকাংশেই এড়ানো সম্ভব হবে। প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমানের নেতৃত্বে বর্তমান সরকার কৃষি ও কৃষকবান্ধব নীতিতে অটল থেকে এই দুর্যোগ মোকাবিলায় সফল হবে, এমনটাই প্রত্যাশা সাধারণ মানুষের।
Leave a Reply