
নিজস্ব প্রতিবেদক:: বাঙালির জাতীয় জীবনের শ্রেষ্ঠ অর্জন স্বাধীনতা আর সেই স্বাধীনতার সুবর্ণ অধ্যায়ে দাঁড়িয়ে দেশের বিভিন্ন ক্ষেত্রে অসামান্য অবদান রাখা ১৫ জন বিশিষ্ট ব্যক্তি এবং ৫টি প্রতিষ্ঠানকে দেওয়া হলো ‘স্বাধীনতা পুরস্কার ২০২৬’।
বৃহস্পতিবার রাজধানীর ওসমানী স্মৃতি মিলনায়তনে আয়োজিত এই রাষ্ট্রীয় অনুষ্ঠানে প্রধান অতিথি হিসেবে উপস্থিত থেকে প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমান বিজয়ীদের হাতে স্বর্ণপদক ও সম্মাননা সনদ তুলে দেন।
এবারের পুরস্কার প্রদান অনুষ্ঠানটি ছিল আবেগময় এবং তাৎপর্যপূর্ণ। বিশেষ করে যখন গণতন্ত্র ও দেশ গঠনে আজীবন লড়াই করে যাওয়া প্রয়াত নেতাদের নাম মরণোত্তর সম্মাননার তালিকায় উঠে আসে, তখন মিলনায়তনে উপস্থিত সবার মাঝে এক গভীর শ্রদ্ধার আবহ তৈরি হয়।
২০২৬ সালের স্বাধীনতা পুরস্কারের সবচেয়ে উল্লেখযোগ্য দিক ছিল প্রয়াত সাবেক প্রধানমন্ত্রী এবং বিএনপি চেয়ারপারসন বেগম খালেদা জিয়াকে দেওয়া মরণোত্তর সম্মাননা। স্বাধীনতা সংগ্রাম, গণতন্ত্রের পুনঃপ্রতিষ্ঠা এবং নারী শিক্ষার প্রসারে তাঁর দীর্ঘদিনের নিরলস প্রচেষ্টার স্বীকৃতিস্বরূপ রাষ্ট্র তাঁকে এই সর্বোচ্চ সম্মানে ভূষিত করেছে। তাঁর পক্ষে পদক গ্রহণ করেন তাঁর নাতনি জাইমা রহমান। জাইমা যখন প্রধানমন্ত্রীর হাত থেকে তাঁর দাদির এই পদক গ্রহণ করছিলেন তখন পুরো মিলনায়তন করতালিতে মুখরিত হয়ে ওঠে।
মুক্তিযুদ্ধে অসামান্য বীরত্বের জন্য বীর মুক্তিযোদ্ধা মেজর মোহাম্মদ আবুল জলিলকে মরণোত্তর স্বাধীনতা পুরস্কার দেওয়া হয়েছে। স্বাধীনতা যুদ্ধে তাঁর রণকৌশল ও সাহসিকতা আজও নতুন প্রজন্মের কাছে অনুপ্রেরণা। এছাড়া প্রতিষ্ঠান হিসেবে দেশ গড়ার কারিগর তৈরির দীর্ঘ ইতিহাসের জন্য ‘ফৌজদারহাট ক্যাডেট কলেজ’ এবার এই সম্মাননা অর্জন করেছে।
বিজ্ঞান ও প্রযুক্তিতে বিশেষ অবদানের জন্য অধ্যাপক ড. জহুরুল করিমকে পদক দেওয়া হয়েছে। চিকিৎসাবিদ্যায় দেশের সাধারণ মানুষের আস্থার প্রতীক হয়ে থাকা ‘ঢাকা মেডিক্যাল কলেজ হাসপাতাল’ এবার প্রাতিষ্ঠানিক ক্যাটাগরিতে পুরস্কৃত হয়েছে।
সংস্কৃতি অঙ্গনে জনপ্রিয় ব্যক্তিত্ব ও গণমাধ্যম ব্যক্তিত্ব এ কে এম হানিফ (হানিফ সংকেত) তাঁর দীর্ঘ কর্মজীবনের স্বীকৃতি হিসেবে এই পুরস্কার গ্রহণ করেন। এছাড়া প্রখ্যাত সংগীতশিল্পী বশির আহমেদকে মরণোত্তর সম্মাননা দেওয়া হয়েছে। সাহিত্যে ড. আশরাফ সিদ্দিকী (মরণোত্তর) এবং ক্রীড়া ক্ষেত্রে টেবিল টেনিস লিজেন্ড জোবেরা রহমান লিনুকে এই সম্মাননা দেওয়া হয়।মিডিয়া ট্রেনিং কোর্স
জনসেবার ক্ষেত্রে এবার একঝাঁক উজ্জ্বল নাম উঠে এসেছে। বীর মুক্তিযোদ্ধা ও জনস্বাস্থ্য আন্দোলনের অগ্রদূত ডা. জাফরুল্লাহ চৌধুরীকে মরণোত্তর সম্মাননা দেওয়া হয়েছে। তাঁর জীবনব্যাপী কাজের স্বীকৃতি হিসেবে তাঁর প্রতিষ্ঠিত ‘গণস্বাস্থ্য কেন্দ্র’ও এবার স্বাধীনতা পুরস্কার অর্জন করেছে। এছাড়া মাহেরীন চৌধুরী (মরণোত্তর), মো. সাইদুল হক এবং আন্তর্জাতিক সংস্থা ‘এস ও এস চিলড্রেন ভিলেজ ইন্টারন্যাশনাল ইন বাংলাদেশ’ এই তালিকায় স্থান পেয়েছে।
গবেষণা ও প্রশিক্ষণে অবদানের জন্য মোহাম্মদ আবদুল বাকী (পিএইচডি), অধ্যাপক ড. এম এ রহিম এবং অধ্যাপক ড. সুকোমল বড়ুয়াকে পুরস্কৃত করা হয়েছে। জনপ্রশাসনে বিশেষ অবদানের জন্য কাজী ফজলুর রহমান (মরণোত্তর) এবং পল্লী উন্নয়নে ‘পল্লী কর্ম-সহায়ক ফাউন্ডেশন’ (পিকেএসএফ) এই সম্মাননা পেয়েছে। পরিবেশ সংরক্ষণে নিরলস কাজ করার স্বীকৃতি পেয়েছেন আব্দুল মুকিত মজুমদার (মুকিত মজুমদার বাবু)।
স্বাধীনতা পুরস্কারপ্রাপ্ত প্রত্যেককে ১৮ ক্যারেট মানের ৫০ গ্রাম ওজনের একটি স্বর্ণপদক, একটি সম্মাননা সনদপত্র এবং সরকার নির্ধারিত সম্মানির চেক প্রদান করা হয়। এটি বাংলাদেশে রাষ্ট্রের পক্ষ থেকে দেওয়া সর্বোচ্চ সম্মান, যা প্রতিবছর স্বাধীনতা দিবস উপলক্ষে ঘোষণা করা হয়।
পুরস্কার প্রদান শেষে সংক্ষিপ্ত বক্তব্যে প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমান বলেন, আজকের এই পদকপ্রাপ্তরা কেবল ব্যক্তি বা প্রতিষ্ঠান নন, তাঁরা আমাদের জাতির আলোকবর্তিকা। তাঁদের মেধা ও শ্রম আজ আমাদের এক নতুন বাংলাদেশের স্বপ্ন দেখাচ্ছে। বিশেষ করে বেগম খালেদা জিয়ার মতো ব্যক্তিত্বকে সম্মাননা প্রদান করতে পারা এই সময়ের দাবি ছিল।তিনি আশা প্রকাশ করেন যে, গুণীজনদের এই সম্মাননা তরুণ প্রজন্মকে দেশপ্রেমে উদ্বুদ্ধ করবে এবং ভবিষ্যতে আরও নতুন নতুন উদ্ভাবনী কাজ করতে প্রেরণা যোগাবে।
বিকেলে আয়োজিত এই অনুষ্ঠানে মন্ত্রিসভার সদস্যবৃন্দ, উর্ধ্বতন সামরিক ও বেসামরিক কর্মকর্তাবৃন্দ এবং সমাজের বিশিষ্ট ব্যক্তিবর্গ উপস্থিত ছিলেন। অনুষ্ঠান শেষে বিজয়ীদের সঙ্গে প্রধানমন্ত্রী এক সৌজন্য ফটোসেশনে অংশ নেন।
Leave a Reply