সোহেল সুলতান মানু, চিতলমারী (বাগেরহাট):: বাগেরহাটের চিতলমারীতে ৫ শতাধিক গ্রাহকের শতকোটি টাকা নিয়ে পালিয়ে যাওয়া রেনেসাঁ এন্টারপ্রাইজের মালিক আনন্দ মোহন বিশ্বাস ও তাঁর ছেলে প্রবীর বিশ্বাস এবং ম্যানেজার বলরাম সাহার বিরুদ্ধে মামলা দায়ের করা হয়েছে। শেখর চন্দ্র হীরা নামের এক গ্রাহক ৬৭ লাখ ৫৭ হাজার টাকা আত্মসাতের অভিযোগ এ মামলাটি দায়ের করেন। অভিযুক্ত আনন্দ মোহন বিশ্বাস রেনেসাঁ এন্টারপ্রাইজের নির্বাহী পরিচালক ও বাগেরহাট সদরের হালিশহর গ্রামের ধর্মগুরু বিজয় গোসাঁই’র ছেলে এবং প্রবীর বিশ্বাস রেনেসাঁ এন্টারপ্রাইজের পরিচালক ও আনন্দ মোহন বিশ্বাসের ছেলে। মামলার বাদী শেখর চন্দ্র হীরা চিতলমারী উপজেলার খড়মখালী গ্রামের শান্তি রঞ্জন হীরার ছেলে। সে পেশায় একজন কৃষক। শেখর চন্দ্র হীরা গত ২১ আগস্ট বাগেরহাট জুডিসিয়াল ম্যাজিস্ট্রেট আদালতে মামলার আবেদন করেন। বিচারক সার্বিক পর্যালোচনান্তে মামলাটি এফআইআর হিসেবে গণ্য করে আদেশ প্রাপ্তির ৪৮ ঘন্টার মধ্যে অত্র আদালতকে অবহিত করার জন্য চিতলমারী থানার অফিসার ইনচার্জকে (ওসি) নির্দেশ দেন। ওসি ২৪ আগস্ট পেনাল কোড ১৮৬০ এর ৪০৬, ৪২০ ও ৩৪ ধারায় ( মামলা নাং-০৮) মামলাটি রুজু করেন। রবিবার (৩১) আগস্ট সকাল সাড়ে ১০ টায় অফিসার ইনচার্জ এস এম শাহাদাৎ হোসেন সাংবাদিকদের এ সব তথ্য নিশ্চিত করেছেন।
# আসামীদের দ্রুত গ্রেপ্তারের দাবি
# বেশিরভাগ গ্রাহক কৃষক ও দিনমজুর
# ধর্ম গুরুর সুনাম কাজে লাগিয়ে প্রতারণা
# ট্রেড লাইসেন্স ছাড়া কোন নিবন্ধন ছিল না রেনেসাঁর
# টাকার দাবিতে করা হয়েছে মানববন্ধন, মিছিল, সমাবেশ ও অভিযোগ
মামলার বাদী শেখর চন্দ্র হীরা ও ভূক্তভোগী গ্রাহকরা জানান, বাগেরহাট সদর উপজেলার বিষ্ণুপুর ইউনিয়নের হালিশহর গ্রামের আনন্দ মোহন বিশ্বাস ২৪ বছর আগে স্থানীয় কৃষকদেরকে ঋণ দেওয়ার জন্য রেনেসাঁ এন্টারপ্রাইজ নামের একটি প্রতিষ্ঠান গড়ে তোলে। ঋণ প্রদানের পাশাপাশি নিজ গ্রাম ও পার্শ¦বর্তী উপজেলা চিতলমারীর কৃষকদের কাছ থেকে এক লাখ টাকায় মাসে ১২০০ টাকা সুদ প্রদানের শর্তে বিনিয়োগ গ্রহন করতে থাকেন। কিছুদিন পর নিজেকে নির্বাহী পরিচালক এবং ছেলে প্রবীর বিশ্বাসকে পরিচালক করে প্রতিষ্ঠিত ক্ষুদ্রঋণ প্রদানকারী এনজিও’র মত স্থানীয়দের কাছ থেকে বিপুল পরিমান বিনিয়োগ গ্রহন করেন। চিতলমারী উপজেলার দূর্গাপুরসহ বিভিন্ন জায়গায় কয়েকটি অফিস এবং বিনিয়োগ সংগ্রহের জন্য বেতনভুক্ত মাঠকর্মী নিয়োগ করেন আনন্দ মোহন বিশ্বাস। মাঠকর্মীরাও নানা প্রলোভন দিয়ে উপজেলার বিভিন্ন এলাকা থেকে বিপুল পরিমান বিনিয়োগ গ্রহন করতে থাকেন। বিপুল পরিমান বিনিয়োগ গ্রহন করলেও এই প্রতিষ্ঠানের কোন সরকারি অনুমোদন নেই। শুধুমাত্র সার কীটনাশক বিক্রি করার জন্য ইউনিয়ন পরিষদ থেকে ট্রেডলাইসেন্স গ্রহন করেছিলেন তাঁরা।
ধর্মগুরু বিজয় গোশাইয়ের ছেলে হওয়ায় স্থানীয়রাও সরল বিশ্বাসে নিজেদের জমানো টাকা ব্যাংকে না রেখে রেনেসাঁ এন্টারপ্রাইজে রাখেন। কিন্তু প্রায় ১৮ মাস ধরে প্রতিষ্ঠানের অফিস তালা দেওয়া, পালিয়েছেন বাবা-ছেলে ও মাঠকর্মীরা। হালিশহর গ্রামে বাড়িতে গিয়েও পাওয়া যাচ্ছে না রেনেসাঁর মালিকদের। কষ্টের টাকা হারিয়ে হতাশায় ভুগছেন বিনিয়োগকারীরা। আনন্দ মোহন বিশ্বাস ও তার ছেলে প্রবীর বিশ্বাস তারককে গ্রেপ্তার করে প্রতারণার শাস্তি দেওয়ার পাশাপাশি টাকা ফেরত চান গ্রাহকরা।
ক্ষতিগ্রস্থ গ্রাহক চিতলমারী উপজেলার খড়মখালি এলাকার বাসিন্দা উত্তম হালদার বলেন, ২০২১ সালে রেনেসাঁ এন্টারপ্রাইজে প্রতিমাসে ১২শ টাকা লাভের শর্তে এক লক্ষ টাকা এককালীন জমা রেখেছিলাম। ১৪ মাস লাভের টাকা দিয়েছে। আড়াই বছর ধরে কোন টাকা দেয় না, তাদের কাউকে পাওয়া যাচ্ছে না। বিভিন্ন এলাকায় যে অফিস ছিল তা সব বন্ধ।
সাবোখালী গ্রামের মলিনা বাড়ৈ নামের এক বিনিয়োগকারী বলেন, দুই ধাপে সাড়ে তিন লক্ষ টাকা রেখেছিলাম, এখন লাভও দেয়না, মূল টাকাও পাইনা।
ভূক্তভোগী কাননচক গ্রামের হাসি রায় বলেন, ‘আমি বিধবা নারী। ৬ বছরে ডাবল দেওয়া স্কিমে ২ লাখ টাকা, মেয়ে দিপা রায়ের নামে ৮ হাজার ৫০০ টাকা ও ছেলে সুজন রায়ের নামে ৮ হাজার ৫০০ টাকা জমা রাখি। এখন দেখি অফিসে তালা।
কাননচক গ্রামের লিপি মন্ডল বলেন, ‘রেনেসাঁ এন্টারপ্রাইজের মালিক আনন্দ মোহন বিশ্বাসের শ্যালক সুশাংশু শেখর সদাইয়ের কথামত ৪ লাখ ৭ হাজার টাকা এককালীন বিনিয়োগ করি। বাবা অনাদী মন্ডল জায়গা বিক্রি করে তার নামে দেড় লাখ টাকা জমা রাখেন। লাভ না দিলেও মূল টাকা ফেরত পাওয়ার জন্য প্রশাসনের হস্তক্ষেপ কামনা করেন লিপি।
ক্ষতিগ্রস্থ গ্রাহক চিতলমারী উপজেলা সদরের মুদিব্যবসায়ী বিকাশ বালা বলেন, আনন্দ মোহন বিশ্বাসের বাবা বিজয় বিশ্বাস এই অঞ্চলের একজন সনাতন ধর্মীর গুরু ছিলেন। তাঁর অসংখ্য ভক্ত রয়েছেন। বিজয় বিশ্বাসের ছেলে হওয়ায় সরল বিশ্বাসে প্রতি লাখে মাসে ১ হাজার ২০০ টাকা লাভের শর্তে ১০ লাখ টাকা এককালীন রেখেছিলাম। আমাকে আর্থিকভাবে শেষ করে দিয়েছে তারা। আমার মত এরকম ৫ শাতাধিক গ্রাহক পথে পথে ঘুরছে। তাঁরা শতকোটি টাকা নিয়ে পালিয়েছে। আমি এই প্রতারকদের শাস্তি চাই।
বিকাশ বালা আরও বলেন, আমরা গ্রাহকরা টাকা ফেরত পাওয়ার জন্য উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তার দপ্তরসহ সরকারি বিভিন্ন দপ্তরে লিখিত অভিযোগ দিয়েছি, মানববন্ধন, বিক্ষোভ মিছিল, মাইকিং ও সভা-সমাবেশ করেছি। তবুও টাকা ফেরত পাওয়া যাচ্ছে না।
রেনেসাঁ এন্টারপ্রাইজের মাঠকর্মী হিসেবে কাজ করা সুশাংশু শেখর সদাই, সত্যজিৎ মন্ডল ও প্রশান্ত মন্ডল বলেন, ‘আমরা প্রতিষ্ঠানটির কর্মচারী হিসেবে কাজ করেছি। মালিকপক্ষ গাঢাকা দিয়েছেন। গ্রাহকদের জমাকৃত টাকা ফেরত না দেওয়ায় আমরাও বিব্রতকর অবস্থায় পড়েছি।’
এ ব্যাপারে জানতে রেনেসাঁ এন্টারপ্রাইজের নির্বাহী পরিচালক আনন্দ মোহন বিশ্বাস ও পরিচালক প্রবীর বিশ্বাস ওরফে তারকের মুঠোফোনে ফোন দিলে তাঁরা তা রিসিভ করেননি।
এ বিষয়ে কথা বলার জন্য হালিশহর এলাকায় আনন্দ মোহন বিশ্বাসের বাড়িতে গেলেও তাঁদেরকে পাওয়া যায়নি। বাড়িতে আনন্দ মোহনের পরিবারের কোন সদস্য নেই। তবে স্থানীয়রা বলছে আনন্দ মোহন বিশ্বাস, স্ত্রী, ছেলে ও ছেলের স্ত্রীকে নিয়ে খুলনায় অবস্থান করছেন। সুযোগ বুঝে ভারতে পালিয়ে যাবেন।
এ ব্যাপারে চিতলমারী থানার অফিসার ইনচার্জ (ওসি) এস এম শাহাদাৎ হোসেন বলেন, ‘বিজ্ঞ আদালতের নির্দেশে পেনাল কোড ১৮৬০ এর ৪০৬, ৪২০ ও ৩৪ ধারায় মামলাটি রুজু করা হয়েছে। আসামীদের গ্রেপ্তার করতে পুলিশের অভিযান অব্যাহত রয়েছে।
Leave a Reply