1. dailybanglarkhabor2010@gmail.com : দৈনিক বাংলার খবর : দৈনিক বাংলার খবর
শনিবার, ২৮ ফেব্রুয়ারী ২০২৬, ১২:২০ পূর্বাহ্ন

পাকিস্তানের ‘অপারেশন গজব লিল-হক’ ও রক্তক্ষয়ী সংঘাতের বিস্তারিত চিত্র

  • প্রকাশিত: শুক্রবার, ২৭ ফেব্রুয়ারী, ২০২৬
  • ৩ বার পড়া হয়েছে

আন্তর্জাতিক ডেস্ক:: দক্ষিণ এশিয়ার ভূ-রাজনীতিতে চরম উত্তেজনা ছড়িয়ে আফগানিস্তান ও পাকিস্তান সীমান্তে শুরু হয়েছে এক ভয়াবহ সামরিক সংঘাত। গত কয়েকদিন ধরে চলা বিচ্ছিন্ন উত্তেজনা বৃহস্পতিবার রাতে সরাসরি যুদ্ধে রূপ নিয়েছে। পাকিস্তান সেনাবাহিনী অপারেশন গজব লিল-হক নামে আফগানিস্তানের অভ্যন্তরে বড় ধরনের সামরিক অভিযান শুরু করার পর দুই প্রতিবেশী দেশের মধ্যে এখন বারুদ আর গোলার শব্দের ঘনঘটা চলছে।

শুক্রবার দিনভর চলা এই রক্তক্ষয়ী সংঘর্ষে দুই পক্ষই একে অপরের ব্যাপক ক্ষয়ক্ষতির দাবি করেছে।

শুক্রবার বিকেলে পাকিস্তান সামরিক বাহিনীর একজন মুখপাত্রের দেওয়া তথ্যমতে, অপারেশন গজব লিল-হক অভিযানে এ পর্যন্ত আফগান তালেবানের ২২৮ জন যোদ্ধা নিহত হয়েছেন। আল-জাজিরার বরাত দিয়ে জানানো হয়েছে, এই সংঘর্ষে অন্তত ৩১৪ জন তালেবান যোদ্ধা আহত হয়েছেন। পাকিস্তান সেনাবাহিনীর দাবি, তারা তালেবানের ৭৪টি সামরিক চৌকি পুরোপুরি ধ্বংস করে দিয়েছে এবং ১৮টি কৌশলগত গুরুত্বপূর্ণ চৌকি নিজেদের দখলে নিয়েছে।

এর আগে সকালে পাকিস্তানের প্রধানমন্ত্রী শাহবাজ শরিফের মুখপাত্র মোশাররফ জাইদি জানিয়েছিলেন, নিহতের সংখ্যা ১৩৩। তবে বিকেলের দিকে সামরিক মুখপাত্রের পরিসংখ্যানে সেই সংখ্যা নাটকীয়ভাবে বেড়ে যায়। ইসলামাবাদ দাবি করেছে, দুই পক্ষের গোলাগুলিতে এ পর্যন্ত ২৭ জন পাকিস্তানি নাগরিক বা সেনা আহত হয়েছেন।

এদিকে পাকিস্তানের দেওয়া বিশাল হতাহতের তথ্যকে সম্পূর্ণ ভিত্তিহীন বলে উড়িয়ে দিয়েছে আফগানিস্তানের তালেবান সরকার। তাদের দেওয়া তথ্যমতে, মাত্র ৮ জন যোদ্ধা নিহত ও ১১ জন আহত হয়েছেন।

আফগানিস্তানের রাষ্ট্রীয় টেলিভিশন চ্যানেল আফগানিস্তান ন্যাশনাল টিভি জানিয়েছে, পাকতিকা প্রদেশে পাকিস্তানের বিমান হামলায় এক নারী ও দুই স্কুল শিক্ষার্থী প্রাণ হারিয়েছে। আবাসিক এলাকায় চালানো এই বোমা হামলায় আরও সাতজন বেসামরিক নাগরিক আহত হয়েছেন। ব্রিটিশ ব্রডকাস্টিং কর্পোরেশনের প্রতিবেদনেও এই হতাহতের বিষয়টি গুরুত্বের সাথে স্থান পেয়েছে, যদিও তারা নিরপেক্ষভাবে তথ্যের সত্যতা যাচাই করতে পারেনি। আফগানিস্তানের সাবেক প্রেসিডেন্ট হামিদ কারজাই এই হামলার তীব্র নিন্দা জানিয়ে বলেন, আফগানরা সাহসের সঙ্গে এই আগ্রাসনের জবাব দেবে।

আফগান সরকারের মুখপাত্র জাবিউল্লাহ মুজাহিদ এক সংবাদ সম্মেলনে দাবি করেছেন, পাকিস্তান সীমান্তে যুদ্ধ থামাতে বারবার যুদ্ধবিরতির অনুরোধ জানাচ্ছিল। তিনি বলেন, আমরা সংলাপের মাধ্যমে সমাধান চাই, কিন্তু পাকিস্তান হামলা চালিয়ে গেলে আমাদের কঠোর জবাব দেওয়ার সামর্থ্য আছে। মুজাহিদ আরও দাবি করেন, তালেবান বাহিনী পাকিস্তানের গুরুত্বপূর্ণ সামরিক লক্ষ্যবস্তুতে হামলা চালিয়েছে।

তিনি কড়া হুঁশিয়ারি দিয়ে বলেন, আমরা বার্তা দিয়েছি, আমাদের হাত তাদের গলা পর্যন্ত পৌঁছাতে পারে। তেহরিক-ই-তালেবান পাকিস্তানের ইস্যুটিকে পাকিস্তান তাদের অভ্যন্তরীণ ব্যর্থতা ঢাকার পূর্বপরিকল্পিত অজুহাত হিসেবে ব্যবহার করছে বলেও তিনি মন্তব্য করেন। একই সাথে ভারতের সাথে আফগানিস্তানের সুসম্পর্ককে পাকিস্তানের বিরুদ্ধে কোনো ষড়যন্ত্র নয় বলেও তিনি সাফ জানিয়ে দেন।

সীমান্তের লড়াই এবার পাকিস্তানের মূল ভূখণ্ডেও ছড়িয়ে পড়ছে। পাকিস্তানের তথ্যমন্ত্রী আতাউল্লাহ তারার দাবি করেছেন, আফগানিস্তান থেকে পাঠানো ড্রোন দিয়ে পাকিস্তানের অ্যাবোটাবাদ, সোয়াবি ও নওশেরা শহরে হামলা চালানো হয়েছে।

যদিও পাকিস্তানি বাহিনী সেই ড্রোনগুলো ভূপাতিত করতে সক্ষম হয়েছে এবং কোনো প্রাণহানি ঘটেনি, তবে এই ঘটনাকে কেন্দ্র করে ইসলামাবাদে চরম উত্তেজনা বিরাজ করছে। আফগানিস্তান ও পাকিস্তানের এই ভয়াবহ সংঘাত এশিয়ার স্থিতিশীলতার জন্য হুমকি হয়ে দাঁড়িয়েছে। পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণে আনতে আন্তর্জাতিক মহল থেকে নানামুখী তৎপরতা শুরু হয়েছে।

বন্ধু দেশ চীন উভয় পক্ষকে সংযত থাকার এবং আলোচনার মাধ্যমে সমস্যা সমাধানের আহ্বান জানিয়েছে। চীনা পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের মুখপাত্র মাও নিং বলেন, তারা নিজস্ব মাধ্যম ব্যবহার করে দুই দেশের মধ্যে মধ্যস্থতা করতে প্রস্তুত। ক্রেমলিন থেকে দেওয়া এক বিবৃতিতে রাশিয়া দুই দেশকে অবিলম্বে লড়াই বন্ধ করার আহ্বান জানিয়েছে। এছাড়া পাকিস্তানের এই সংকটে সৌদি আরব ও পাকিস্তানের মধ্যে উচ্চপর্যায়ের আলোচনা হয়েছে বলে জানা গেছে। সৌদি আরব উত্তেজনা কমিয়ে শান্তি ফেরানোর ওপর জোর দিচ্ছে।

তোরখাম সীমান্তসহ বিভিন্ন পয়েন্টে এখন ভারী মর্টার আর মেশিনগানের গর্জন শোনা যাচ্ছে। পাকিস্তানের দাবি অনুযায়ী, তালেবানের হামলায় তাদের ৫৫ সেনা নিহতের কথা তালেবান প্রচার করলেও ইসলামাবাদ তা অস্বীকার করেছে। সীমান্ত এলাকার গ্রামগুলো থেকে সাধারণ মানুষ নিরাপদ আশ্রয়ে সরে যেতে শুরু করেছে।

পাকতিকার বিধ্বস্ত গ্রামগুলোতে ধ্বংসপ্রাপ্ত গাড়ি আর বোমার গর্তের পাশে শিশুদের বিষণ্ণ মুখ যেন যুদ্ধের ভয়াবহতারই প্রতিচ্ছবি। অপারেশন গজব লিল-হক দীর্ঘমেয়াদী যুদ্ধে রূপ নেবে নাকি আন্তর্জাতিক চাপে দুই দেশ আলোচনার টেবিলে ফিরবে, তা এখন সময়ের অপেক্ষা। তবে আপাতত সীমান্তে বারুদের গন্ধ আর আকাশজুড়ে ড্রোনের আনাগোনা এক অনিশ্চিত ভবিষ্যতের ইঙ্গিত দিচ্ছে।

 

সংবাদটি শেয়ার করুন

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *

আরো সংবাদ পড়ুন
© সর্বস্বত্ব স্বত্বাধিকার সংরক্ষিত দৈনিক বাংলার খবর
ওয়েবসাইট ডিজাইন : ইয়োলো হোস্ট