বুধবার, ২৪ জুন ২০২৬, ০২:৫২ অপরাহ্ন
সর্বশেষ :
নকআউট থেকে ফাইনালের সমীকরণ, সবকিছুই যেন আর্জেন্টিনার পক্ষে! ইরানের তহবিল মুক্ত করছে যুক্তরাষ্ট্র, হরমুজ প্রণালী সচল করার আভাস প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমানকে এবার সুইজারল্যান্ড সফরের আমন্ত্রণ আনোয়ার ইব্রাহিম ও তার স্ত্রীর প্রতি কৃতজ্ঞতা জানালেন প্রধানমন্ত্রী আ’লীগের অপতৎপরতা ঠেকাতে চিতলমারী বিএনপি’র ৪টি সংগঠনের মিছিল পাইকগাছায় ‘নিষিদ্ধ ঘোষিত আওয়ামী লীগের’ বিরুদ্ধে বিএনপি ও সহযোগী সংগঠনের বিক্ষোভ মিছিল ও সমাবেশ নারী ও কন্যাশিশুর প্রতি সহিংসতা প্রতিরোধে অংশীজনদের সঙ্গে ব্র্যাকের অ্যাডভোকেসি ডায়লগ পরিবেশ রক্ষায় ‘সবুজ মোংলা সমৃদ্ধ উপকূল’ সংগঠনের কমিটি গঠন চট্টগ্রামে ভেজাল লুব অয়েল ও কাঁচামাল জব্দ করেছে কোস্টগার্ড পাইকগাছায় মহিলাদের মৎস্য চাষ বিষয়ক প্রশিক্ষণ অনুষ্ঠিত

যেভাবে খামেনিকে হত্যার ব্লু-প্রিন্ট সাজিয়েছিল মোসাদ ও সিআইএ

  • প্রকাশিত: মঙ্গলবার, ৩ মার্চ, ২০২৬
  • ১৩০ বার পড়া হয়েছে

নিজস্ব প্রতিবেদক:: মধ্যপ্রাচ্যের ইতিহাসের মোড় ঘুরিয়ে দেওয়া এক অবিশ্বাস্য সামরিক ও গোয়েন্দা অভিযানের সাক্ষী হলো বিশ্ব। ইরানের দীর্ঘকালীন সর্বোচ্চ নেতা আয়াতুল্লাহ আলী খামেনির মৃত্যু কেবল একটি রাষ্ট্রপ্রধানের হত্যাকাণ্ড নয়, বরং এটি কয়েক দশকের গোয়েন্দা সাধনা এবং অত্যাধুনিক প্রযুক্তির এক চরম বহিঃপ্রকাশ।

শনিবার সকালে তেহরানের প্রাণকেন্দ্রে পরিচালিত মাত্র এক মিনিটের সেই প্রলয়ঙ্করী হামলায় ধূলিসাৎ হয়ে গেছে ইরানের কয়েক দশকের শক্তিশালী নেতৃত্ব।

এই অভিযানের নেপথ্যে থাকা গোয়েন্দা সমীকরণ এবং ইসরায়েল-যুক্তরাষ্ট্রের সমন্বিত কৌশলের গভীরে যাওয়ার চেষ্টা করেছে আমাদের এই বিশেষ বিশ্লেষণ।

শনিবার সকাল। তেহরানের সরকারি দপ্তরগুলো যখন দৈনন্দিন কাজে ব্যস্ত হওয়ার প্রস্তুতি নিচ্ছিল, ঠিক তখনই আকাশ থেকে নেমে আসে মৃত্যু। ইসরায়েলি সামরিক বাহিনীর দাবি অনুযায়ী, খামেনি এবং তাঁর সাতজন শীর্ষ নিরাপত্তা কর্মকর্তাকে লক্ষ্য করে এই হামলা চালানো হয়। মাত্র ৬০ সেকেন্ডের মধ্যে একাধিক লক্ষ্যবস্তুতে আঘাত হানা হয়। এতে খামেনির পরিবারের অন্তত ১২ জন সদস্য এবং ইরানি প্রশাসনের আরও ৪০ জন জ্যেষ্ঠ নেতা প্রাণ হারান।

এই হামলাটি ছিল তথাকথিত ‘সার্জিক্যাল স্ট্রাইক’-এর এক চরম উদাহরণ। কোনো দীর্ঘস্থায়ী যুদ্ধ নয়, বরং এক মিনিটের একটি ঝটিকাতরঙ্গ পুরো একটি শাসনব্যবস্থার মেরুদণ্ড ভেঙে দিয়েছে। স্যাটেলাইট চিত্রে দেখা গেছে, খামেনির কার্যালয় চত্বর থেকে ওঠা কালো ধোঁয়ার কুণ্ডলী একটি যুগের সমাপ্তি ঘোষণা করছে।

খামেনিকে হত্যার এই মিশনে ইসরায়েলি গোয়েন্দা সংস্থা মোসাদ এবং মার্কিন কেন্দ্রীয় গোয়েন্দা সংস্থা সিআইএ-র মধ্যে যে স্তরের সমন্বয় দেখা গেছে, তা আগে কখনো দেখা যায়নি।

কয়েক দশক ধরে মোসাদ ইরানের ভেতরে তাদের ‘হিউম্যান ইন্টেলিজেন্স’ বা মানব-গোয়েন্দা নেটওয়ার্ক তৈরি করেছে। ইসরায়েলি বিশ্লেষক ইয়োসি মেলম্যানের মতে, মোসাদ ২০ বছর আগে তাদের কৌশলে বড় পরিবর্তন এনেছিল। তারা বাইরের এজেন্ট পাঠানোর বদলে ইরানের ভেতরের অসন্তুষ্ট নাগরিকদের নিয়োগ দেওয়া শুরু করে। এই ‘লোকাল সোর্স’রাই খামেনির দৈনন্দিন রুটিন, তাঁর খাবারের উৎস, এমনকি তাঁর আবর্জনা ফেলার পদ্ধতি পর্যন্ত নজরদারিতে রেখেছিল।

গত ছয় মাস ধরে সিআইএ তাদের সিগন্যাল ইন্টেলিজেন্স বা আড়িপাতার তথ্য দিয়ে ইসরায়েলকে সহায়তা করেছে। খামেনি অত্যন্ত সতর্ক থাকা সত্ত্বেও তাঁর সহযোগীদের ফোন কল এবং ডিজিটাল ফুটপ্রিন্ট ট্র্যাক করে সিআইএ। নিউ ইয়র্ক টাইমসের তথ্য অনুযায়ী, শনিবার সকালে যে একটি গুরুত্বপূর্ণ বৈঠক হবে এবং সেখানে খামেনি সশরীরে উপস্থিত থাকবেন এই অকাট্য তথ্যটি সিআইএ-ই ইসরায়েলকে নিশ্চিত করেছিল।

এই ধরনের অপারেশন অনেকটা ‘জিগস পাজল’ মেলানোর মতো। হাজার হাজার ছোট ছোট তথ্য জোড়া দিয়ে একটি বড় ছবি তৈরি করা হয়।

তিনি বলেন, ‘আমরা এমন এক পৃথিবীতে বাস করছি যেখানে প্রতিটি মানুষ কোনো না কোনো ডিজিটাল বা শারীরিক ছাপ রেখে যায়। খামেনি বা তাঁর সহযোগীরা যতই সতর্ক থাকুন না কেন, তাঁদের কোনো না কোনো ছোট ভুল বা অসতর্কতা গোয়েন্দাদের কাছে বড় ক্লু হয়ে ধরা দিয়েছে।

বিশেষ করে ইরানি কর্মকর্তাদের ফোন ব্যবহারের আসক্তিকে কাজে লাগিয়েছে গোয়েন্দারা। বার্নার ফোন বা অস্থায়ী ফোন ব্যবহার করেও শেষ রক্ষা হয়নি, কারণ প্রযুক্তির সাহায্যে সেই ফোনের অবস্থান এবং ব্যবহারকারীর কণ্ঠস্বর শনাক্ত করা সম্ভব হয়েছিল।

ইসরায়েলের বিদেশের মাটিতে হত্যার দীর্ঘ ইতিহাস থাকলেও কোনো রাষ্ট্রপ্রধানকে হত্যার ঘটনা এটাই প্রথম। তবে এই বিজয়োল্লাসের মধ্যেও সংশয়ের সুর শোনা যাচ্ছে খোদ ইসরায়েল ও যুক্তরাষ্ট্রের বিশেষজ্ঞ মহলে।

আমোস ইয়াদলিনের মতো সাবেক সামরিক গোয়েন্দা প্রধানরা একে ‘কৌশলগত চমক’ হিসেবে দেখলেও ইয়োসি মেলম্যান সতর্ক করেছেন। তিনি মনে করেন, ‘ইসরায়েল মূলত গুপ্তহত্যার প্রেমে মগ্ন। ‘হামাস বা হিজবুল্লাহর উদাহরণ টেনে তিনি বলেন, নেতাদের হত্যা করে কখনো আদর্শ বা কোনো শক্তিশালী গোষ্ঠীকে নির্মূল করা যায় না। একজনের শূন্যস্থান পূরণ করতে আরেকজন চলে আসে। খামেনির মৃত্যু হয়তো সাময়িকভাবে ইরানকে অচল করে দিয়েছে, কিন্তু দীর্ঘমেয়াদে এটি আরও উগ্র কোনো নেতৃত্বের জন্ম দিতে পারে।

মজার ব্যাপার হলো, ইসরায়েল গত বছরই এই হামলা চালাতে চেয়েছিল। কিন্তু তৎকালীন (এবং বর্তমান) প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প আঞ্চলিক যুদ্ধের আশঙ্কায় তখন সায় দেননি। তবে গত বছরের সংক্ষিপ্ত যুদ্ধ এবং ইরানের পারমাণবিক স্থাপনায় হামলার পর ওয়াশিংটনের সুর বদলে যায়। নেতানিয়াহু এবং ট্রাম্পকে খামেনির মৃতদেহের ছবি দেখানো হয়েছে বলে যে খবর রটেছে, তা মধ্যপ্রাচ্যের ক্ষমতার ভারসাম্যের পরিবর্তনের এক নিষ্ঠুর ইঙ্গিত।

খামেনির মৃত্যুর পর দুবাইয়ের জেবেল আলী বন্দর থেকে শুরু করে বাহরাইনের মানামা পর্যন্ত সহিংসতার খবর পাওয়া যাচ্ছে। ড্রোন হামলা এবং অস্থিরতা ছড়িয়ে পড়েছে পুরো অঞ্চলে। মোসাদের সাবেক কর্মকর্তা ওদেদ আইলামের মতে, “আধুনিক যুদ্ধ এখন কেবল ট্যাংক বা কামানের নয়; এটি এখন তথ্য এবং উপযুক্ত টাইমিংয়ের যুদ্ধ।” সেই ৬০ সেকেন্ডের টাইমিং এখন পুরো মধ্যপ্রাচ্যকে এক অনিশ্চিত গন্তব্যের দিকে ঠেলে দিয়েছে।

সিআইএর সাবেক কর্মকর্তা রুয়েল গেরেখ্ট নৈতিকভাবে হত্যাকাণ্ডকে সমর্থন করলেও কৌশলগতভাবে একে একটি ‘ভুল’ হিসেবে দেখছেন। তাঁর মতে, “আপনি যখন কোনো দেশের শীর্ষ নেতাকে সরিয়ে দেন, তখন আপনি সমস্যার সমাধান করেন না; বরং আপনি একটি নতুন এবং হয়তো আরও ভয়াবহ সমস্যার জন্ম দেন।

আয়াতুল্লাহ আলী খামেনির পতন ইরানের ইসলামি বিপ্লব পরবর্তী ইতিহাসের সবচেয়ে বড় ধাক্কা। এটি যেমন ইসরায়েলি গোয়েন্দা শ্রেষ্ঠত্বের প্রমাণ, তেমনি এটি মধ্যপ্রাচ্যে এক দীর্ঘস্থায়ী সংঘাতের বীজও বুনে দিল। ৬০ সেকেন্ডের সেই অপারেশন হয়তো সফল হয়েছে, কিন্তু তার ফলে সৃষ্ট কম্পন কত বছর ধরে বিশ্বকে সইতে হবে, তা সময়ই বলে দেবে।

সংবাদটি শেয়ার করুন

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *

আরো সংবাদ পড়ুন
© সর্বস্বত্ব স্বত্বাধিকার সংরক্ষিত দৈনিক বাংলার খবর
Theme Customized By BreakingNews