
বাণিজ্য প্রতিবেদক:: আন্তর্জাতিক ভূ-রাজনীতির নাটকীয় মোড় এবং মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্পের কঠোর সামরিক অবস্থানের ঘোষণায় বিশ্বজুড়ে মূল্যবান ধাতুর বাজারে বড় ধরনের অস্থিরতা তৈরি হয়েছে।
বিশেষ করে ইরানে সামরিক অভিযান জোরদার করার মার্কিন ইঙ্গিতে নিরাপদ বিনিয়োগ হিসেবে পরিচিত স্বর্ণের দামে দেখা দিয়েছে বিশাল পতন। মাত্র এক দিনের ব্যবধানে আন্তর্জাতিক স্পট মার্কেটে স্বর্ণের দাম প্রায় ২.৮ শতাংশ কমেছে, যার ঢেউ আছড়ে পড়তে পারে বাংলাদেশের স্থানীয় বাজারেও।
বৃহস্পতিবার এক প্রাইম-টাইম ভাষণে মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প ইরানের ওপর আরও আগ্রাসী হামলার হুঁশিয়ারি দেন।
তিনি দাবি করেন, যুক্তরাষ্ট্র এই সংঘাতে তাদের কৌশলগত লক্ষ্য অর্জনের খুব কাছাকাছি পৌঁছেছে। ট্রাম্পের এই যুদ্ধংদেহী মনোভাব বিনিয়োগকারীদের মধ্যে এক ধরনের অনিশ্চয়তা তৈরি করেছে। যারা ধারণা করেছিলেন সংঘাত প্রশমিত হবে বা যুদ্ধবিরতি আসবে, তারা হতাশ হয়ে স্বর্ণের বাজার থেকে বিনিয়োগ সরিয়ে নিচ্ছেন। ফলে দুই সপ্তাহের সর্বোচ্চ অবস্থান থেকে হঠাৎ করেই নিচে নেমে এসেছে স্বর্ণের দাম।
বার্তাসংস্থা রয়টার্সের তথ্যমতে, বৃহস্পতিবার স্পট মার্কেটে স্বর্ণের দাম ২.৮ শতাংশের বেশি কমে প্রতি আউন্স ৪ হাজার ৬২২.৫৯ ডলারে দাঁড়িয়েছে। দিনের শুরুতে এই পতনের হার ৪ শতাংশ ছাড়িয়ে গিয়েছিল। এর ফলে টানা চার দিনের ঊর্ধ্বমুখী প্রবণতা ধূলিসাৎ হয়ে গেল। একই সময়ে মার্কিন গোল্ড ফিউচার ৩.৪ শতাংশ কমে ৪ হাজার ৬৪৯ ডলারে নেমে এসেছে।
মার্কিন ডলারের শক্ত অবস্থান এবং ১০ বছর মেয়াদি ট্রেজারি ইল্ড বেড়ে যাওয়ায় ডলার-নির্ভর স্বর্ণের ওপর চাপ বেড়েছে। যখন ডলার শক্তিশালী হয়, তখন অন্যান্য মুদ্রার ক্রেতাদের জন্য স্বর্ণ কেনা ব্যয়বহুল হয়ে পড়ে, যা চাহিদাকে কমিয়ে দেয়।
স্বর্ণের দাম কমলেও উল্টো চিত্র দেখা গেছে জ্বালানি তেলের বাজারে। ট্রাম্প ইরানের জ্বালানি অবকাঠামোতে হামলার ইঙ্গিত দেওয়ার পর ব্রেন্ট অপরিশোধিত তেলের দাম ৬ শতাংশের বেশি বেড়ে গেছে।
ক্যাপিটাল ডট কমের সিনিয়র বিশ্লেষক কাইল রড্ডা মনে করেন, তেলের দাম বৃদ্ধি মুদ্রাস্ফীতির আশঙ্কাকে আরও উসকে দিয়েছে। এর ফলে ফেডারেল রিজার্ভ সুদের হার কমানোর পরিবর্তে দীর্ঘ সময় উচ্চ হার বজায় রাখতে পারে এমন আশঙ্কায় বিনিয়োগকারীরা অনুৎপাদনশীল সম্পদ স্বর্ণ ছেড়ে নগদ অর্থের দিকে ঝুঁকছেন।
আন্তর্জাতিক বাজারের এই বিশাল পতন এমন এক সময়ে এলো যখন বাংলাদেশে স্বর্ণের দাম ইতিহাসের সর্বোচ্চ পর্যায়ে রয়েছে। মাত্র একদিন আগে, অর্থাৎ ১ এপ্রিল, বাংলাদেশ জুয়েলার্স অ্যাসোসিয়েশন (বাজুস) ভরিতে ৩ হাজার ২৬৬ টাকা বাড়িয়ে নতুন দাম নির্ধারণ করেছিল।
বর্তমানে দেশের বাজারে স্বর্ণের দাম ক্যারেটভেদে ভিন্নভাবে নির্ধারিত হয়েছে। ২২ ক্যারেটের প্রতি ভরি স্বর্ণের দাম ২,৪৭,৯৭৭ টাকা, ২১ ক্যারেটের প্রতি ভরি ২,৩৬,৭২১ টাকা এবং ১৮ ক্যারেটের প্রতি ভরি ২,০২,৮৯৫ টাকা নির্ধারণ করা হয়েছে। অন্যদিকে সনাতন পদ্ধতির স্বর্ণের প্রতি ভরি বিক্রি হচ্ছে ১,৬৫,২৭৯ টাকায়।
স্বর্ণের আন্তর্জাতিক বাজার পর্যবেক্ষণ করে বাজুস সাধারণত স্থানীয় দাম সমন্বয় করে থাকে। সংগঠনের সূত্রমতে, বিশ্ববাজারে যদি এই নিম্নমুখী প্রবণতা আরও দু-একদিন স্থায়ী হয়, তবে দেশের বাজারেও বড় ধরনের দরপতন হতে পারে। গত ২৪ ঘণ্টায় আন্তর্জাতিক বাজারে যে হারে দাম কমেছে, সেই অনুপাতে সমন্বয় করা হলে দেশের বাজারে স্বর্ণের দাম ভরিপ্রতি ৫ থেকে ৭ হাজার টাকা পর্যন্ত কমতে পারে বলে ধারণা করছেন বাজার সংশ্লিষ্টরা। তবে সবটুকুই নির্ভর করছে বৈশ্বিক স্থিতিশীলতা ও ডলারের হারের ওপর।
স্বর্ণের পাশাপাশি অন্যান্য মূল্যবান ধাতুর বাজারেও দরপতন লক্ষ্য করা গেছে। রূপা, প্লাটিনাম ও প্যালাডিয়াম সবগুলোর দামই কমেছে। স্পট সিলভার ৭ শতাংশের বেশি কমে ৭১.০৭ ডলারে নেমেছে। প্লাটিনামের দাম ৩.১ শতাংশ কমে দাঁড়িয়েছে ১,৯০২.৬৫ ডলারে। অন্যদিকে প্যালাডিয়ামের দামও ১.৮ শতাংশ কমেছে, যা সামগ্রিকভাবে মূল্যবান ধাতুর বাজারে নিম্নমুখী প্রবণতার ইঙ্গিত দিচ্ছে।
দাম কমায় প্রতিবেশী দেশ ভারতে স্বর্ণের চাহিদা বেড়েছে এবং সেখানে প্রথমবারের মতো ‘প্রিমিয়ামে’ লেনদেন হচ্ছে। অন্যদিকে, বিশ্বের বৃহত্তম স্বর্ণের ভোক্তা চীনে ক্রেতারা আরও দাম কমার অপেক্ষায় রয়েছেন, যার ফলে সেখানে প্রিমিয়াম কিছুটা কমেছে।
২০০৮ সালের পর মার্চ মাসে স্বর্ণের দামে সবচেয়ে বড় (১১ শতাংশ) মাসিক পতন দেখা গেল। ট্রাম্পের ইরান নীতি এবং বৈশ্বিক মুদ্রাস্ফীতির এই দ্বিমুখী চাপে স্বর্ণ তার ‘সেফ হ্যাভেন’ বা নিরাপদ বিনিয়োগের তকমা হারাচ্ছে বলে মনে করছেন অনেক বিশেষজ্ঞ। বাংলাদেশের সাধারণ ক্রেতা ও গয়না ব্যবসায়ীরা এখন গভীর আগ্রহে বাজুসের পরবর্তী বিজ্ঞপ্তির অপেক্ষায় আছেন। মধ্যবিত্তের নাভিশ্বাস ওঠা বাজারে স্বর্ণের এই সম্ভাব্য দরপতন কিছুটা হলেও স্বস্তি নিয়ে আসতে পারে।
Leave a Reply