
আন্তর্জাতিক ডেস্ক:: বিশ্ব রাজনীতির কেন্দ্রবিন্দু এখন তেহরান, ওয়াশিংটন আর ইসলামাবাদের কূটনৈতিক টেবিল। একদিকে মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্পের ধ্বংসাত্মক যুদ্ধের হুমকি, অন্যদিকে ইরানের প্রেসিডেন্ট মাসুদ পেজেশকিয়ানের সার্বভৌমত্বের প্রশ্নে আপসহীন অবস্থান এই দুইয়ের যাঁতাকলে পিষ্ট হচ্ছে বিশ্বশান্তি।
সম্প্রতি ইরানের প্রেসিডেন্ট মাসুদ পেজেশকিয়ান ওয়াশিংটনকে সরাসরি প্রশ্ন ছুঁড়ে দিয়েছেন, ‘একটি জাতির বৈধ পারমাণবিক অধিকার কেড়ে নেওয়ার ট্রাম্প কে?‘তার এই মন্তব্য কেবল একটি রাজনৈতিক বিবৃতি নয়, বরং এটি আসন্ন কোনো বড় সংঘাতের পূর্বলক্ষণ হিসেবে দেখছেন বিশ্লেষকরা।
ইরানের প্রেসিডেন্ট মাসুদ পেজেশকিয়ান তেহরানে এক জনাকীর্ণ সংবাদ সম্মেলনে ডোনাল্ড ট্রাম্পের আধিপত্যবাদী নীতির তীব্র সমালোচনা করেন। তিনি বলেন, আন্তর্জাতিক আইন অনুযায়ী প্রতিটি স্বাধীন রাষ্ট্রের বৈজ্ঞানিক ও প্রযুক্তিগত অধিকার রয়েছে। ট্রাম্পের মতো একজন বিদেশি রাষ্ট্রপ্রধান কীভাবে ঠিক করে দেবেন যে ইরান কোন প্রযুক্তি ব্যবহার করবে আর কোনটি করবে না?
পেজেশকিয়ানের এই বক্তব্যে ফুটে উঠেছে ইরানের দীর্ঘদিনের পুঞ্জীভূত ক্ষোভ। ইরান বারবার দাবি করে আসছে যে তাদের পারমাণবিক কর্মসূচি কেবল শান্তিপূর্ণ ও বেসামরিক উদ্দেশ্যে, কিন্তু ট্রাম্প প্রশাসন একে পারমাণবিক অস্ত্র তৈরির কৌশল হিসেবে বিবেচনা করে আসছে।
ডোনাল্ড ট্রাম্প তার স্বভাবজাত ভঙ্গিতে ইরানকে যে আলটিমেটাম দিয়েছেন, তা আন্তর্জাতিক কূটনীতির ইতিহাসে বিরল। তিনি হুঁশিয়ারি দিয়েছেন যে, বুধবারের মধ্যে ইরান যদি যুক্তরাষ্ট্রের শর্ত মেনে কোনো দীর্ঘমেয়াদী চুক্তিতে সই না করে, তবে মার্কিন সামরিক বাহিনী এমন গোলাবর্ষণ শুরু করবে যা পৃথিবী আগে কখনো দেখেনি। ট্রাম্পের ভাষায়, ‘ইরান সভ্যতাকে এক রাতেই শেষ করে দেওয়া সম্ভব।
হোয়াইট হাউসের এই অবস্থানের বিপরীতে মার্কিন সেনেটর বার্নি স্যান্ডার্সসহ অনেক বিশ্বনেতা ট্রাম্পকে ‘মানসিকভাবে ভারসাম্যহীন‘এবং ‘বিপজ্জনক‘হিসেবে আখ্যা দিয়েছেন। কিন্তু ট্রাম্প পিছু হটার পাত্র নন। তিনি স্পষ্ট করেছেন, ইরানকে কোনোভাবেই পারমাণবিক সক্ষমতা অর্জন করতে দেওয়া হবে না।
বর্তমান উত্তেজনার অন্যতম প্রধান রণাঙ্গন হলো হরমুজ প্রণালী। ইরান ঘোষণা করেছে যে, মার্কিন নৌ-অবরোধ প্রত্যাহার না হওয়া পর্যন্ত এই কৌশলগত জলপথটি বন্ধ থাকবে। হরমুজ প্রণালী দিয়ে বিশ্বের ২০ শতাংশ তেল পরিবাহিত হয়। এটি বন্ধ হওয়ার ফলে বিশ্ববাজারে অপরিশোধিত তেলের দাম আকাশচুম্বী হয়েছে, যার প্রভাব পড়ছে প্রতিটি দেশের সাধারণ মানুষের ওপর।
ইরানি সামরিক বাহিনী (আইআরজিসি) জানিয়েছে, হরমুজ এখন সম্পূর্ণ তাদের নিয়ন্ত্রণে এবং এই পথে চলাচল করতে হলে ইরানকে ‘রিয়াল’ মুদ্রায় টোল দিতে হবে। এমনকি কোনো কোনো ক্ষেত্রে টোল দিলেও জাহাজ চলাচলের সুযোগ বন্ধ করে দেওয়ার খবর পাওয়া গেছে। এর ফলে আন্তর্জাতিক জাহাজ চলাচল ৯৪ শতাংশ কমে গেছে এবং প্রায় ৩ হাজার জাহাজ সমুদ্রে আটকা পড়েছে।
ভারত এই সংকটে সরাসরি ক্ষতিগ্রস্ত দেশগুলোর মধ্যে অন্যতম। সম্প্রতি হরমুজ প্রণালীতে ভারতের পতাকাবাহী দুটি জাহাজ, ‘জগ অর্ণব’ এবং ‘সানমার হেরাল্ড’-এ ইরানি গানবোট থেকে গুলিবর্ষণ করা হয়েছে। ভারত এই ঘটনায় দিল্লির ইরানি রাষ্ট্রদূতকে তলব করে তীব্র প্রতিবাদ জানিয়েছে। ভারতীয় নৌ-চলাচলের নিরাপত্তা নিশ্চিত করতে দিল্লি এখন তেহরান ও ওয়াশিংটন উভয়ের সাথেই সমান্তরাল আলোচনা চালিয়ে যাচ্ছে।
ইরান ও যুক্তরাষ্ট্রের এই সংঘাত কেবল তেহরানে সীমাবদ্ধ নেই। লেবাননের দক্ষিণ সীমান্ত এখন রণক্ষেত্রে পরিণত হয়েছে। ইসরায়েলি বাহিনী দক্ষিণ লেবাননের গ্রামের পর গ্রাম গুঁড়িয়ে দিচ্ছে। অন্যদিকে হিজবুল্লাহর মুহুর্মুহু রকেট ও ড্রোন হামলায় ইসরায়েলি ভূখণ্ডে ব্যাপক ক্ষয়ক্ষতির খবর পাওয়া যাচ্ছে।
ইরানের সর্বোচ্চ নেতার উপদেষ্টা মোজতবা আলী খামেনি যুক্তরাষ্ট্র ও ইসরায়েলকে ‘তিক্ত পরাজয়‘এর হুঁশিয়ারি দিয়েছেন। কমলার হ্যারিসও ট্রাম্পের সমালোচনা করে বলেছেন, ট্রাম্পের অপরিণামদর্শী নীতির কারণে মার্কিন সেনারা এখন চরম ঝুঁকির মুখে।
আগামী সোমবার পাকিস্তানে যুক্তরাষ্ট্র ও ইরানের প্রতিনিধিদের মধ্যে একটি উচ্চপর্যায়ের বৈঠকের কথা রয়েছে। পাকিস্তান ও মিসরের মধ্যস্থতায় এই আলোচনা আয়োজনের প্রচেষ্টা চলছে। তবে তেহরান সাফ জানিয়ে দিয়েছে যে, যতক্ষণ না পর্যন্ত ওয়াশিংটন একটি ‘সমঝোতার রূপরেখা‘চূড়ান্ত করছে, ততক্ষণ কোনো আনুষ্ঠানিক চুক্তি সম্ভব নয়। ইরানের উপ-পররাষ্ট্রমন্ত্রী আব্বাস আরাগচি বলেছেন, আমাদের সদিচ্ছা আছে, কিন্তু যুক্তরাষ্ট্রের ওপর বিন্দুমাত্র বিশ্বাস নেই।
ইরানের পরিস্থিতি এখন থমথমে। ট্রাম্পের হুমকির মুখে ইরানি জনগণ রাস্তায় নেমে সামরিক বাহিনীর প্রতি সমর্থন জানাচ্ছে। সেখানে দীর্ঘ ১০০০ ঘণ্টারও বেশি সময় ধরে ইন্টারনেট সেবা বিঘ্নিত হচ্ছে। মার্কিন হামলায় ইরানের সাবেক পররাষ্ট্রমন্ত্রী কামাল খারাজিসহ অনেক বেসামরিক নাগরিক নিহত হওয়ার খবর পাওয়া গেছে। তা সত্ত্বেও ইরানি সামরিক বাহিনী বলছে, তাদের ‘আঙুল এখনো ট্রিগারে‘ এবং যেকোনো মুহূর্তে পূর্ণাঙ্গ যুদ্ধ শুরু হতে পারে।
ভূ-রাজনৈতিক বিশ্লেষকদের মতে, ট্রাম্পের মূল লক্ষ্য ইরানকে আত্মসমর্পণে বাধ্য করা এবং তাদের পারমাণবিক সক্ষমতা চিরতরে ধ্বংস করা। অন্যদিকে, ইরানের লক্ষ্য হলো তাদের তেলের বাজার সচল রাখা এবং মধ্যপ্রাচ্যে মার্কিন আধিপত্য খর্ব করা। এই দুই শক্তির দ্বন্দ্বে জাতিসংঘ মহাসচিব আন্তোনিও গুতেরেস গভীর উদ্বেগ প্রকাশ করেছেন। চীন ও রাশিয়া ইতোমধ্যে মার্কিন নৌ-অবরোধের সমালোচনা করেছে এবং একে ‘জলদস্যুতা‘হিসেবে অভিহিত করেছে।
আগামী কয়েক ঘণ্টা পুরো বিশ্বের জন্য অত্যন্ত সংবেদনশীল। যদি বুধবারের মধ্যে কোনো কার্যকর চুক্তি না হয়, তবে মধ্যপ্রাচ্যে এমন এক যুদ্ধের দাবানল জ্বলতে পারে যা কেবল তেহরান বা ওয়াশিংটন নয়, বরং পুরো বিশ্ব অর্থনীতিকে ধ্বংসের কিনারে নিয়ে যাবে।
পেজেশকিয়ানের প্রশ্ন আসলে একটি বহুমুখী চ্যালেঞ্জ। এটি কেবল ট্রাম্পের ব্যক্তির বিরুদ্ধে নয়, বরং পশ্চিমের ‘কর্তৃত্ববাদী’ মনোভাবের বিরুদ্ধে এক দীর্ঘস্থায়ী প্রতিরোধের ডাক। বিশ্ব এখন রুদ্ধশ্বাসে অপেক্ষা করছে, ইসলামাবাদ থেকে শান্তির সাদা পায়রা উড়বে নাকি মধ্যপ্রাচ্যের আকাশ চিরে মার্কিন যুদ্ধবিমানের গর্জন শোনা যাবে।
Leave a Reply