
আন্তর্জাতিক ডেস্ক:: মধ্যপ্রাচ্যের আকাশসীমায় এখন যুদ্ধের ঘনঘটা। একদিকে ইরানি উপকূলে মার্কিন রণতরীর উপস্থিতি, অন্যদিকে তেহরানের পক্ষ থেকে একের পর এক নজিরবিহীন হুঁশিয়ারি। এই স্নায়ুযুদ্ধের মধ্যেই মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্পকে নিয়ে ইরানের একজন শীর্ষ কর্মকর্তার মন্তব্য আন্তর্জাতিক রাজনীতিতে নতুন করে উত্তাপ ছড়িয়েছে। ইরান সরাসরি হুঁশিয়ারি দিয়েছে যে, প্রয়োজন হলে ডোনাল্ড ট্রাম্পকে ভেনিজুয়েলার প্রেসিডেন্ট নিকোলাস মাদুরোর মতো পরিস্থিতিতে পড়তে হতে পারে।
ইরানের জ্যেষ্ঠ নীতি-নির্ধারক ও প্রভাবশালী তাত্ত্বিক হাসান রহিমপুর আজগাদি সম্প্রতি এক বিস্ফোরক মন্তব্য করেছেন। তেহরানে চলমান বিক্ষোভ এবং সে বিষয়ে ওয়াশিংটনের উস্কানিদাতা অবস্থানের কঠোর সমালোচনা করতে গিয়ে তিনি বলেন, ইরানের উচিত মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্পকে সরাসরি বন্দি করা।
আজগাদি উদাহরণ টেনে বলেন, যুক্তরাষ্ট্র যেভাবে ভেনিজুয়েলার প্রেসিডেন্ট নিকোলাস মাদুরোর ওপর চাপ সৃষ্টি করে তাকে ক্ষমতাচ্যুত বা বন্দি করার চেষ্টা চালিয়েছিল, ইরানের উচিত ট্রাম্পের ক্ষেত্রেও ঠিক একই রকম ‘মাদুরো-স্টাইল’ পদ্ধতি প্রয়োগ করা। ইরানের রাজনৈতিক মহলে এ ধরনের মন্তব্যকে যুক্তরাষ্ট্রের অভ্যন্তরীণ বিষয়ে ইরানের পাল্টা হস্তক্ষেপ এবং ট্রাম্পের প্রতি চরম ব্যক্তিগত হুঁশিয়ারি হিসেবে দেখা হচ্ছে।
সোমবার মার্কিন বিমানবাহী একটি বিশাল রণতরী মধ্যপ্রাচ্যের সংঘাতপূর্ণ অঞ্চলে এসে পৌঁছায়। ওয়াশিংটনের এই পদক্ষেপকে ইরানকে সরাসরি ভয় দেখানোর একটি কৌশল হিসেবে দেখা হচ্ছে। তবে ইরানের পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয় সাফ জানিয়ে দিয়েছে, বিদেশি রণতরীর উপস্থিতি তাদের প্রতিরক্ষা নীতি বা কূটনীতিতে কোনো প্রভাব ফেলতে পারবে না।
পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের মুখপাত্র ইসমাইল বাঘাই গণমাধ্যমকে বলেন, আমাদের অবস্থান অত্যন্ত পরিষ্কার। ইরান কোনোদিন যুদ্ধকে স্বাগত জানায়নি এবং ভবিষ্যতেও যুদ্ধ চায় না। কিন্তু এর অর্থ এই নয় যে কূটনীতি আমাদের একমাত্র ঢাল। বিদেশিরা যদি মনে করে যুদ্ধজাহাজ এনে আমাদের দেশ রক্ষার মনোবল ভেঙে দেবে, তবে তারা বোকার স্বর্গে বাস করছে।
ইরানের প্রতিরক্ষা মন্ত্রণালয়ের পক্ষ থেকেও যুদ্ধের প্রস্তুতি নিয়ে কড়া বার্তা দেওয়া হয়েছে। মন্ত্রণালয়ের মুখপাত্র রেজা তালায়ি-নিক বলেন, গত জুন মাসের ১২ দিনের সংক্ষিপ্ত যুদ্ধে ইরানের যে শক্তিমত্তা বিশ্ব দেখেছিল, বর্তমান প্রস্তুতি তার চেয়ে কয়েকগুণ বেশি।
তিনি হুঁশিয়ারি উচ্চারণ করে বলেন, যুক্তরাষ্ট্র বা ইসরায়েল যদি সামান্যতম আগ্রাসনের দুঃসাহস দেখায়, তবে ইরান যে জবাব দেবে তা হবে আগের যে কোনো সময়ের চেয়ে বেশি যন্ত্রণাদায়ক এবং চূড়ান্ত। শত্রু যদি মনে করে তারা সহজে জয়ী হবে, তবে তাদের জন্য ইতিহাসের সবচেয়ে বড় পরাজয় অপেক্ষা করছে।
ইরান ও যুক্তরাষ্ট্রের এই পাল্টাপাল্টি হুমকির মধ্যে বিশ্বনেতারা গভীর উদ্বেগ প্রকাশ করেছেন। বিশেষ করে রাশিয়া সতর্ক করে জানিয়েছে, ইরানে কোনো ধরনের হামলা হলে তার পরিণতি হবে ভয়াবহ এবং তা পুরো বিশ্ব অর্থনীতিকে স্থবির করে দিতে পারে।
প্রেসিডেন্ট ট্রাম্প অবশ্য এর আগে দাবি করেছিলেন যে, ইরান চুক্তি করতে চায় এবং তেহরান থেকে তাকে বহুবার ফোন করা হয়েছে। কিন্তু বাস্তবে ইরানি কর্মকর্তাদের বয়ানে চুক্তির পরিবর্তে সামরিক মোকাবিলার সুরই বেশি জোরালো হচ্ছে।
আন্তর্জাতিক বিশ্লেষকরা মনে করছেন, ২০২৬ সালের শুরু থেকেই ইরান ও যুক্তরাষ্ট্রের মধ্যকার সম্পর্ক যেভাবে তিক্ততার চরমে পৌঁছেছে, তাতে যে কোনো সময় একটি অনাকাঙ্ক্ষিত যুদ্ধ বেঁধে যেতে পারে। ইরানের অভ্যন্তরে চলমান বিক্ষোভ এবং তাতে যুক্তরাষ্ট্রের প্রকাশ্য সমর্থন তেহরানকে ক্ষুব্ধ করেছে। মাদুরোর সাথে ট্রাম্পের তুলনা এবং তাকে বন্দি করার হুমকি কেবল একটি রাজনৈতিক বক্তব্য নয়, বরং এটি ওয়াশিংটনের প্রতি ইরানের চরম আস্ফালনের বহিঃপ্রকাশ।
মধ্যপ্রাচ্যের এই বারুদে ঠাসা পরিস্থিতিতে ইরান তার জনগণের সমর্থন এবং সামরিক সক্ষমতাকে প্রধান অস্ত্র হিসেবে ব্যবহার করছে। এখন দেখার বিষয়, ডোনাল্ড ট্রাম্প এবং তার প্রশাসন ইরানের এই ‘মাদুরো-স্টাইল’ হুমকির বিপরীতে কী পদক্ষেপ নেয়।
Leave a Reply