
ডেস্ক:: জাতীয় কবি কাজী নজরুল ইসলামের সাহিত্য ও সৃষ্টিশীলতাকে অন্যায়, অবিচার এবং শোষণের বিরুদ্ধে চিরন্তন হাতিয়ার উল্লেখ করে বাংলাদেশ জাতীয়তাবাদী দলের (বিএনপি) চেয়ারম্যান ও প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমান বলেছেন, কবির ক্ষুরধার লেখনী ছিল ঔপনিবেশিক শাসন, বৈষম্য, কুসংস্কার এবং সামাজিক সব ধরনের পঙ্কিলতার বিরুদ্ধে এক অনন্য ধারালো অস্ত্র। নজরুল ছিলেন এমন এক বিরল প্রতিভাধর ব্যক্তিত্ব, যাঁর প্রভাব ও চেতনা এ দেশের আপামর জনসাধারণের জাতীয় জীবনের প্রতিটি ক্রান্তিলগ্নে গভীর পথপ্রদর্শক হিসেবে কাজ করেছে।
বৃহস্পতিবার সকালে বাংলাদেশ সচিবালয়ে মন্ত্রিপরিষদ বিভাগ আয়োজিত এক বিশেষ সভায় গণভবন থেকে ভার্চুয়ালি যুক্ত হয়ে বছরব্যাপী ‘নজরুল বর্ষ ২০২৬-২০২৭’ কর্মসূচির আনুষ্ঠানিক উদ্বোধনকালে প্রধানমন্ত্রী এসব কথা বলেন।
এ সময় তিনি জাতীয় কবির স্মৃতিবিজড়িত ময়মনসিংহের ত্রিশালকে ‘নজরুল নগরী’ হিসেবে ঘোষণা করার লক্ষ্যে সরকারের পক্ষ থেকে সম্ভাব্যতা যাচাইয়ের কাজ চলছে বলেও গুরুত্বপূর্ণ তথ্য প্রকাশ করেন।
আজকের এই উদ্বোধনী সভা থেকে সরকারের পক্ষ থেকে আনুষ্ঠানিকভাবে ২০২৬ সালের ২৫ মে থেকে ২০২৭ সালের ২৫ মে পর্যন্ত সময়কালকে ‘নজরুল বর্ষ’ হিসেবে ঘোষণা করা হয়। প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমান তাঁর ভাষণে বলেন, কবি নজরুল ইসলাম আমাদের সামাজিক, রাজনৈতিক, সাহিত্যিক, সাংস্কৃতিক এবং মননশীলতার এমন এক সুউচ্চ স্তম্ভ, যাঁর প্রভাব শৈশব থেকে শুরু করে বার্ধক্য পর্যন্ত মানুষের জীবনের প্রতিটি স্তরকে স্পর্শ করে। তিনি কোনো নির্দিষ্ট যুগের কবি নন, বরং চিরকালের জন্য প্রাসঙ্গিক।
ময়মনসিংহের ত্রিশালের সাথে কবির শৈশব ও জীবনের গভীর যোগসূত্রের কথা স্মরণ করে প্রধানমন্ত্রী জানান, কবির স্মৃতিকে প্রাতিষ্ঠানিক রূপ দিতে এবং পরবর্তী প্রজন্মের কাছে তা সংরক্ষণ করতে ত্রিশালকে একটি পূর্ণাঙ্গ ‘নজরুল নগরী’ বা ‘নজরুল সিটি’ হিসেবে রূপান্তর করার একটি বিশেষ পরিকল্পনা সরকারের বিবেচনাধীন রয়েছে। বর্তমানে সংশ্লিষ্ট বিভাগ এর ব্যবহারিক ও প্রশাসনিক সম্ভাব্যতা যাচাই করে দেখছে।

জাতীয় কবিকে বিভিন্ন বিশেষণে ভূষিত করে প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমান বলেন, কাজী নজরুল ইসলাম একাধারে আমাদের বিদ্রোহী কবি, প্রেমের কবি, সাম্যের কবি এবং আমাদের তারুণ্যের ও ঐতিহ্যের মূল চালিকাশক্তি। একটি পরাধীন, নিগৃহীত এবং শৃঙ্খলিত জাতির ভাগ্যাকাশে তাঁর আর্বিভাব ঘটেছিল এক চরম অন্ধকার ভেদ করা আলোকবর্তিকার মতো। তিনি আমাদের শিখিয়েছেন কীভাবে মাথা উঁচু করে বাঁচতে হয়।
কবির সৃষ্টির বহুমাত্রিকতা তুলে ধরে প্রধানমন্ত্রী আরও বলেন, বিপ্লবী ও দেশাত্মবোধক গান, ইসলামী সংস্কৃতি ও ঐতিহ্যচেতনা, ভজন, কীর্তন, শ্যামাসংগীত থেকে শুরু করে প্রেম, প্রকৃতি এবং মানবতাবোধ- সব ক্ষেত্রেই নজরুল আমাদের সাহিত্যের সবচেয়ে বিশুদ্ধ ও সমৃদ্ধতম রূপটি উপহার দিয়েছেন। মানুষের আশা-আকাঙ্ক্ষা, জীবনের তীব্র সংগ্রাম এবং অধিকার আদায়ের প্রতিটি ভাষা তাঁর লেখনীতে এক অনন্য উচ্চতা পেয়েছে। তাঁর এই বৈচিত্র্যময় সৃষ্টিশীলতা সব বয়স ও সব প্রজন্মের মানুষকে সমানভাবে আকর্ষণ করে।
প্রধানমন্ত্রী স্মরণ করিয়ে দেন যে, ১৯৭১ সালের মহান মুক্তিযুদ্ধ চলাকালীন সময়ে নজরুলের কবিতা ও উদ্দীপনামূলক গানগুলো রণাঙ্গনে মুক্তিযোদ্ধাদের জন্য ছিল অন্যতম প্রধান অনুপ্রেরণার উৎস। শুধু মুক্তিযুদ্ধই নয়, এ দেশের প্রতিটি গণতান্ত্রিক আন্দোলন, স্বৈরাচারবিরোধী সংগ্রাম এবং যেকোনো ধরনের অন্যায় ও সামাজিক বৈষম্যের বিরুদ্ধে প্রতিবাদের প্রধান ভাষা হিসেবে নজরুলের গান ও কবিতা সবসময় সামনের সারিতে অবতীর্ণ হয়েছে।
বর্তমান তথ্যপ্রযুক্তির অবাধ প্রবাহ এবং তরুণ প্রজন্মের ওপর কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা বা আর্টিফিশিয়াল ইন্টেলিজেন্সের (AI) ইতিবাচক ও নেতিবাচক প্রভাবের বিষয়টি অত্যন্ত গুরুত্বের সাথে নিজের বক্তব্যে টেনে আনেন প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমান। তিনি বলেন, আজকের এই জটিল ও দ্রুত পরিবর্তনশীল গ্লোবাল টেকনোলজি বা বৈশ্বিক প্রযুক্তির যুগে তরুণ সমাজকে নৈতিক অবক্ষয় থেকে রক্ষা করতে নজরুলের জীবনমুখী সাহিত্য দারুণ এক আদর্শিক ঢাল হিসেবে কাজ করতে পারে।
তিনি বলেন, শিশুদের নৈতিকতা ও সাহসিকতা শেখাতে নজরুলের ‘আমি হব সকাল বেলার পাখি’ কিংবা কিশোর ও তরুণদের ঘরের বন্দিদশা ভেঙে অজানাকে জয় করার প্রত্যয় জাগাতে ‘থাকব নাকো বদ্ধ ঘরে, দেখব এবার জগৎটাকে’- এই কবিতাগুলোর শিক্ষাগত মূল্য বর্তমান সময়ে আরও বেশি প্রাসঙ্গিক হয়ে উঠেছে। প্রযুক্তিকে গ্রহণ করার পাশাপাশি তরুণদের মনস্তাত্ত্বিক বিকাশে এবং নৈতিক মূল্যবোধ গঠনে নজরুলের এই সৃষ্টিগুলোকে মূলধারায় নিয়ে আসা প্রয়োজন।
একজন রাজনৈতিক কর্মী হিসেবে নিজের অনুভূতি প্রকাশ করতে গিয়ে প্রধানমন্ত্রী বলেন, আমি বিশ্বাস করি, জাতীয় কবি কাজী নজরুল ইসলাম হলেন আসলে বাংলাদেশের মূল আত্মারই এক প্রতিচ্ছবি। তিনি তাঁর সমগ্র জীবনজুড়ে কেবল সাম্যের গান গেয়ে গেছেন। যেখানে হিন্দু, মুসলিম, বৌদ্ধ কিংবা খ্রিস্টানের মধ্যে কোনো ভেদাভেদ বা প্রাচীর ছিল না। মানুষের পরিচয় ছিল তাঁর কাছে সবকিছুর ঊর্ধ্বে।”
কবির এই অসাম্প্রদায়িক ও সাম্যবাদী দর্শনকে বর্তমান রাষ্ট্র কাঠামোর সাথে মেলাতে গিয়ে প্রধানমন্ত্রী দৃঢ়তার সাথে ঘোষণা করেন যে, বর্তমান সরকার দেশে একটি সম্পূর্ণ বৈষম্যহীন, আধুনিক এবং অন্তর্ভুক্তিমূলক রাষ্ট্র ও সমাজ গঠনে শতভাগ প্রতিশ্রুতিবদ্ধ। যেখানে ধর্ম, বর্ণ বা জাতিগত পরিচয় নির্বিশেষে দেশের প্রতিটি নাগরিক এবং প্রতিটি জীব সম্পূর্ণ নিরাপদ ও মর্যাদাপূর্ণ পরিবেশে নিজেদের অধিকার নিয়ে বসবাস করতে পারবে।
প্রধানমন্ত্রী নজরুল গবেষক, ভক্ত এবং দেশের সকল অঞ্চলের নজরুলসংগীত ও সাংস্কৃতিক কর্মীদের সমন্বয়ে গঠিত ‘নজরুল বর্ষ উদযাপন জাতীয় কমিটি’-কে অত্যন্ত সুচারুভাবে বছরব্যাপী এই আয়োজন সফল করার আহ্বান জানান।
তিনি দেশের প্রতিটি জেলা ও বিভাগীয় পর্যায়ে নজরুলের ওপর বিশেষ সাহিত্য সম্মেলন, উচ্চতর গবেষণা কার্যক্রম, সেমিনার, সাংস্কৃতিক উৎসব, নজরুলসংগীতের বিশেষ আসর, নাট্যোৎসব এবং চিত্র প্রদর্শনীর আয়োজন করার জন্য সংশ্লিষ্ট মন্ত্রণালয়কে দিকনির্দেশনা প্রদান করেন।
একই সাথে তিনি দুঃখ প্রকাশ করে বলেন, নজরুল বর্ষের আয়োজনে সরকারি কর্মকর্তাদের পাশাপাশি মাঠপর্যায়ের প্রকৃত নজরুল গবেষক ও গুণী শিল্পীদের আরও বেশি সম্পৃক্ত করা ও প্রাধান্য দেওয়া উচিত ছিল।
নজরুল মানবিক আদর্শকে পথপ্রদর্শক হিসেবে মেনে নিয়ে তরুণদের সুন্দর ভবিষ্যতের দিকে এগিয়ে যাওয়ার আহ্বান জানিয়ে প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমান আনুষ্ঠানিকভাবে এই ‘নজরুল বর্ষ ২০২৬-২০২৭’ এর শুভ উদ্বোধন ঘোষণা করেন। উদ্বোধনের অংশ হিসেবে তিনি এই ঐতিহাসিক দিনটিকে স্মরণীয় করে রাখতে একটি বিশেষ স্মারক ডাকটিকিট এবং ‘নজরুল বর্ষ’-এর আনুষ্ঠানিক লোগো উন্মোচন করেন।
মন্ত্রিপরিষদ বিভাগের এই বিশেষ উদ্বোধনী সভায় সভাপতিত্ব করেন দেশের সংস্কৃতি বিষয়ক মন্ত্রী নিতাই রায় চৌধুরী। অনুষ্ঠানে বিশেষ অতিথি হিসেবে উপস্থিত ছিলেন স্থানীয় সরকার, পল্লী উন্নয়ন ও সমবায় (এলজিআরডি) মন্ত্রী মির্জা ফখরুল ইসলাম আলমগীর, তথ্য ও সম্প্রচার মন্ত্রী জহির উদ্দিন স্বপন, প্রধানমন্ত্রীর কৌশল ও নীতি বিষয়ক উপদেষ্টা ড. জাহেদ উর রহমান এবং প্রধানমন্ত্রীর প্রেস সচিব এএএম সালেহ শিবলী।
এ ছাড়া দেশের বিভিন্ন প্রান্ত থেকে বরেণ্য নজরুল গবেষক, বিশ্ববিদ্যালয়সমূহের উপাচার্য, ঊর্ধ্বতন সরকারি কর্মকর্তা এবং দেশের শীর্ষস্থানীয় নজরুলসংগীত শিল্পীরা এই ভার্চুয়াল প্ল্যাটফর্মে যুক্ত ছিলেন।