
নিজস্ব প্রতিবেদক:: বাংলাদেশের আসন্ন ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচনকে সামনে রেখে ইসলামপন্থী দলগুলোর ঐক্য প্রচেষ্টায় বড় ধরনের ফাটল ধরেছে। আসন ভাগাভাগি নিয়ে দীর্ঘদিনের টানাপোড়েন ও দেনদরবারের পর অবশেষে জামায়াতে ইসলামীর নেতৃত্বাধীন ১১ দলীয় নির্বাচনী ঐক্য থেকে বেরিয়ে যাওয়ার চূড়ান্ত ঘোষণা দিয়েছে ইসলামী আন্দোলন বাংলাদেশ।
শুক্রবার বিকেলে পুরানা পল্টনে দলীয় কার্যালয়ে আয়োজিত এক জরুরি সংবাদ সম্মেলনে দলটি জানিয়েছে, তারা কোনো জোটবদ্ধ নয়, বরং ২৬৮টি আসনে এককভাবে লাঙল প্রতীক বা দলীয় মনোনয়ন নিয়ে প্রতিদ্বন্দ্বিতা করবে।
সংবাদ সম্মেলনে ইসলামী আন্দোলনের জ্যেষ্ঠ যুগ্ম মহাসচিব ও মুখপাত্র গাজী আতাউর রহমান জামায়াতে ইসলামীর নেতৃত্বের কড়া সমালোচনা করেন।
তিনি অভিযোগ করেন, জোটের মূল লক্ষ্য অর্জিত হয়নি এবং ওয়ান বক্স পলিসি বা একক প্রার্থী দেওয়ার কৌশলটি ভিন্নখাতে প্রবাহিত হয়েছে।
আদর্শিক দ্বন্দ্বের কথা উল্লেখ করে তিনি বলেন, জামায়াত শক্তিশালী দল হতে পারে, তবে ইসলামী আন্দোলন বাংলাদেশ আদর্শিকভাবে তাদের চেয়ে অনেক বেশি শক্তিশালী। জামায়াত আমির ঘোষণা দিয়েছেন যে তারা শরীয়াহ আইন বাস্তবায়ন করবেন না। তারা আল্লাহর আইন থেকে সরে গেছেন।
তিনি আরও যোগ করেন, ইনসাফের প্রশ্নে ইসলামী আন্দোলনকে জোটের ভেতর বৈরিতার শিকার হতে হয়েছে।
গাজী আতাউর রহমান জানান, আসন্ন ১২ ফেব্রুয়ারির নির্বাচনে লড়তে ইসলামী আন্দোলনের পক্ষ থেকে ২৭০টি আসনে মনোনয়নপত্র জমা দেওয়া হয়েছিল। এর মধ্যে বাছাই প্রক্রিয়ায় দুটি আসনে মনোনয়নপত্র বাতিল হলেও বাকি ২৬৮টি আসনেই তাদের প্রার্থীরা বৈধতা পেয়েছেন।
তিনি সাফ জানিয়ে দেন, ২৬৮টি আসনে আমাদের প্রার্থীরা বর্তমানে মাঠে কাজ করছেন। তারা আলাদাভাবে নির্বাচন করবেন এবং একজন প্রার্থীও মনোনয়নপত্র প্রত্যাহার করবেন না। ৩০০ আসনের মধ্যে বাকি ৩২টি আসনে যাদের নীতি ও আদর্শের মিল রয়েছে, এমন অরাজনৈতিক বা সমমনা প্রার্থীদের সমর্থন দেওয়ার কথা ভাবছে দলটি।
উল্লেখ্য, গত কয়েক মাস ধরে জামায়াতের নেতৃত্বাধীন ১১টি ইসলামপন্থী ও সমমনা দলের মধ্যে আসন সমঝোতা নিয়ে আলোচনা চলছিল। গতকাল বৃহস্পতিবার রাতে রাজধানীর ডিপ্লোমা ইঞ্জিনিয়ার্স ইনস্টিটিউশনে আয়োজিত সংবাদ সম্মেলনে জামায়াত ও মিত্র ১০টি দল ২৫৩টি আসনে প্রার্থীর নাম ঘোষণা করে। সেখানে ইসলামী আন্দোলনের জন্য ৪৭টি আসন ফাঁকা রাখা হয়েছিল এ আশায় যে, তারা হয়তো শেষ মুহূর্তে জোটে ফিরবে। কিন্তু আজ সেই সমঝোতাকে প্রত্যাখ্যান করে ইসলামী আন্দোলন স্পষ্ট জানিয়ে দিয়েছে, তারা জোটে থাকছে না।
রাজনৈতিক বিশ্লেষকরা মনে করছেন, ইসলামী আন্দোলন অন্তত ৫০ থেকে ৬০টি আসন দাবি করেছিল, যা দিতে জামায়াত অসম্মতি জানানোয় এ বিভক্তি চূড়ান্ত রূপ নিল।
গতকাল রাতে আসন ঘোষণার সময় জামায়াতের আমির ডা. শফিকুর রহমান বলেছিলেন, জোট ভাঙেনি, কোনো একটা দল একমত হতে না পারা মানে জোট ভাঙা নয়। তবে ইসলামী আন্দোলনের আজকের সংবাদ সম্মেলন ও কড়া বক্তব্যের পর এটি পরিষ্কার যে, ইসলামপন্থীদের এক ভোট ও এক বক্স নীতি কার্যত ব্যর্থ হয়েছে। আগামী ১২ ফেব্রুয়ারি অনুষ্ঠেয় জাতীয় নির্বাচনে ইসলামী আন্দোলনের এ এককভাবে লড়ার সিদ্ধান্ত নির্বাচনী সমীকরণে বড় ধরনের প্রভাব ফেলতে পারে।
বিশেষ করে দক্ষিণবঙ্গ ও পীর সাহেব চরমোনাইয়ের ভক্তবেষ্টিত এলাকাগুলোতে জামায়াত ও ইসলামী আন্দোলনের মধ্যে ভোট ভাগাভাগির সুবিধা অন্য বড় দলগুলো পেতে পারে বলে ধারণা করা হচ্ছে।
সংবাদ সম্মেলন শেষে ইসলামী আন্দোলনের নেতাকর্মীরা পুরানা পল্টন এলাকায় বিক্ষোভ মিছিল করেন এবং নির্বাচনের মাঠ ছাড়বেন না বলে শপথ নেন। এখন দেখার বিষয়, এ ত্রিমুখী লড়াইয়ে ইসলামপন্থী ভোটাররা কার পক্ষে রায় দেন।
Leave a Reply