
চাঁদপুর:: বাংলাদেশের গ্রামীণ অর্থনীতি, কৃষি ব্যবস্থার আধুনিকায়ন এবং জলাশয় সংস্কারের এক নতুন দিগন্তের সূচনা হলো চাঁদপুরে। ১৯৭৮ সালে তৎকালীন রাষ্ট্রপতি জিয়াউর রহমানের হাত ধরে যে খাল খনন বিপ্লবের সূচনা হয়েছিল, দীর্ঘ ৪৮ বছর পর ঠিক সেই পথ ধরেই হাঁটলেন তার সুযোগ্য সন্তান, বর্তমান প্রধানমন্ত্রী ও বিএনপি চেয়ারম্যান জনাব তারেক রহমান।
শনিবার দুপুরে তিনি চাঁদপুর জেলার শাহরাস্তি উপজেলায় ঐতিহাসিকভাবে গুরুত্বপূর্ণ ‘খোর্দ্দ খাল’ পুনঃখনন কাজের আনুষ্ঠানিক উদ্বোধন করেন। এই উদ্যোগের মাধ্যমে স্থানীয় কৃষি খাতে এক অভূতপূর্ব জোয়ার আসবে এবং দীর্ঘদিনের জলাবদ্ধতা ও সেচ সংকটের স্থায়ী সমাধান হবে বলে আশা করছেন সংশ্লিষ্টরা।
আজ দুপুর ঠিক ২টা ৪০ মিনিটে প্রধানমন্ত্রী জনাব তারেক রহমান সড়কপথে শাহরাস্তি উপজেলার টামটা দক্ষিণ ইউনিয়নের ওয়ারুক বাজার সংলগ্ন খোর্দ্দ খাল এলাকায় এসে পৌঁছান। প্রধানমন্ত্রীর আগমনকে কেন্দ্র করে সমগ্র শাহরাস্তি এলাকায় উৎসবমুখর পরিবেশের সৃষ্টি হয়। দুপুর থেকেই স্থানীয় সর্বস্তরের জনগণ, দলীয় নেতাকর্মী এবং কৃষকেরা খালের দুই পাড়ে সমবেত হতে শুরু করেন।
প্রধানমন্ত্রী অনুষ্ঠানস্থলে পৌঁছালে স্থানীয় নেতৃবৃন্দ এবং প্রশাসনের পক্ষ থেকে তাঁকে উষ্ণ অভ্যর্থনা জানানো হয়। এরপর তিনি খোর্দ্দ খাল পুনঃখনন কর্মসূচির ফলক উন্মোচন করেন। ফলক উন্মোচন শেষে এক আবেগঘন ও উদ্দীপনাপূর্ণ পরিবেশে প্রধানমন্ত্রী নিজে কোদাল দিয়ে মাটি কেটে এই ঐতিহাসিক পুনঃখনন কাজের আনুষ্ঠানিক শুভ উদ্বোধন ঘোষণা করেন।
মাটি কাটার পর পরিবেশের ভারসাম্য রক্ষা এবং খালের পাড় টেকসই করার লক্ষ্যে তিনি খালের পাড়ে বৃক্ষরোপণ কর্মসূচির অংশ হিসেবে গাছের চারা রোপণ করেন। এ সময় উপস্থিত হাজারো মানুষের করতালি এবং গগনবিদারী স্লোগানে মুখরিত হয়ে ওঠে পুরো ওয়ারুক বাজার এলাকা।
এই ঐতিহাসিক মুহূর্তে প্রধানমন্ত্রীর সাথে রাষ্ট্রের উচ্চপর্যায়ের মন্ত্রী এবং স্থানীয় রাজনৈতিক নেতৃবৃন্দ উপস্থিত ছিলেন। অনুষ্ঠানে অন্যান্যদের মধ্যে উপস্থিত ছিলেন, দুর্যোগ ব্যবস্থাপনা ও ত্রাণ মন্ত্রী,আসাদুল হাবিব দুলু, স্থানীয় সংসদ সদস্য মোমিনুল হক, চাঁদপুর জেলা বিএনপির সাধারণ সম্পাদক, অ্যাডভোকেট সেলিম উল্লাহ সেলিম, শাহরাস্তি উপজেলা বিএনপির সভাপতি, আয়াত আলী ভূঁইয়া, শাহরাস্তি উপজেলা বিএনপির সহ-সভাপতি ও আবু ইউসুফ রূপম।
এছাড়াও স্থানীয় প্রশাসনের ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তাবৃন্দ, পানি উন্নয়ন বোর্ডের প্রকৌশলীবৃন্দ এবং স্থানীয় গণ্যমান্য ব্যক্তিবর্গ এই উদ্বোধনী অনুষ্ঠানে অংশ নেন। ইতিহাস ও উত্তরাধিকার ১৯৭৮ থেকে ২০২৬
খোর্দ্দ খালের এই পুনঃখনন কাজ কেবল একটি সাধারণ উন্নয়ন প্রকল্প নয়, এর সাথে জড়িয়ে আছে বাংলাদেশের গ্রামীণ উন্নয়নের এক মহান ইতিহাস। ১৯৭৮ সালে তৎকালীন সফল রাষ্ট্রপতি শহীদ জিয়াউর রহমান (বীর উত্তম) গ্রামীণ অর্থনীতিকে স্বাবলম্বী করার লক্ষ্যে দেশব্যাপী ‘খাল খনন বিপ্লব’ শুরু করেছিলেন। সেই সময় তিনি নিজেই চাঁদপুরের এই খোর্দ্দ খালটি খনন কাজের উদ্বোধন করেছিলেন এবং স্থানীয় জনগণকে সাথে নিয়ে মাটি কেটেছিলেন।
ইতিহাসের এক অপূর্ব সমীকরণ দৃশ্যমান হলো আজ শাহরাস্তিতে। যে খালটি আজ থেকে ৪৮ বছর আগে বাবা রাষ্ট্রপতি জিয়াউর রহমান খনন করেছিলেন, কালের পরিক্রমায় পলি জমে ভরাট হয়ে যাওয়া সেই খালটিই আজ ২০২৬ সালে এসে পুনঃখনন করছেন তাঁরই পুত্র প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমান।
স্থানীয় প্রবীণ ব্যক্তিরা স্মৃতিচারণ করে বলেন, জিয়াউর রহমানের সেই খাল খনন কর্মসূচি এই অঞ্চলের কৃষিতে আমূল পরিবর্তন এনেছিল। দীর্ঘদিন সংস্কারের অভাবে খালটি ভরাট হয়ে যাওয়ায় কৃষকেরা পুনরায় সংকটে পড়েছিলেন। আজ তারেক রহমানের হাত ধরে খালটি তার পুরোনো যৌবন ফিরে পাওয়ার সুযোগ সৃষ্টি হওয়ায় পুরো চাঁদপুর জেলায় আনন্দের বন্যা বয়ে যাচ্ছে।জনসমুদ্র ও নেতার প্রতি অকুণ্ঠ সমর্থন
খোর্দ্দ খালের পুনঃখনন কাজ উদ্বোধনের পর প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমান খাল সংলগ্ন মাঠে নির্মিত একটি সুসজ্জিত মঞ্চে আরোহণ করেন। এ সময় খালের দুই পাড়ে এবং সমাবেশস্থলে অপেক্ষমাণ হাজার হাজার নেতাকর্মী, সমর্থক ও সাধারণ জনতা হাত নেড়ে প্রধানমন্ত্রীকে শুভেচ্ছা জানান। স্লোগানে স্লোগানে মুখরিত হয়ে ওঠে চারপাশ।
উপস্থিত জনতার উদ্দেশ্যে প্রধানমন্ত্রী হাত নেড়ে শুভেচ্ছা বিনিময় করেন। দীর্ঘদিন পর প্রিয় নেতাকে এত কাছ থেকে দেখতে পেয়ে সাধারণ মানুষের মধ্যে ব্যাপক উচ্ছ্বাস লক্ষ্য করা গেছে। সমাবেশস্থলে উপস্থিত স্থানীয় কৃষকেরা জানান, এই খালটি পুনঃখনন করা হলে তাদের সেচ ব্যবস্থার বিশাল উন্নতি হবে, যার ফলে বছরে তিনবার ফসল ফলানো সম্ভব হবে।
শাহরাস্তির খোর্দ্দ খালের কাজ উদ্বোধন শেষেই প্রধানমন্ত্রীর সফরসূচি শেষ হয়নি। এদিন বিকালেই চাঁদপুর সদর উপজেলার শাহ মাহমুদপুর ইউনিয়নের কুমারডুগি গ্রামে আরেকটি গুরুত্বপূর্ণ খাল পুনঃখনন কাজ উদ্বোধনের কথা রয়েছে প্রধানমন্ত্রীর।
চাঁদপুর সদরের ঘোষের হাট সংলগ্ন অত্যন্ত পরিচিত ‘বিশ্ব খাল’ নামের এই খালটি দীর্ঘদিন ধরে আবর্জনা ও পলি জমে অবরুদ্ধ হয়ে আছে। প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমান আজ বিকেলেই এই বিশ্ব খালের পুনঃখনন কাজের ফলক উন্মোচন ও কাজের সূচনা করবেন। একই দিনে জেলার দুটি বৃহৎ ও জনগুরুত্বপূর্ণ খালের পুনঃখনন কাজের এই উদ্যোগ চাঁদপুরের সামগ্রিক কৃষি ও অর্থনৈতিক চালচিত্র বদলে দেবে বলে মনে করছেন বিশেষজ্ঞরা।
চাঁদপুর জেলা মূলত কৃষিপ্রধান অঞ্চল এবং এর একটি বড় অংশ ডাকাতিয়া নদীর অববাহিকায় অবস্থিত। খোর্দ্দ খাল এবং বিশ্ব খাল- এই দুটি জলাশয়ই স্থানীয় পানি নিষ্কাশন এবং সেচ ব্যবস্থার মূল ধমনী হিসেবে কাজ করে। দীর্ঘ কয়েক দশকে সঠিক রক্ষণাবেক্ষণের অভাবে খাল দুটি ভরাট হয়ে যাওয়ায় বর্ষা মৌসুমে কৃত্রিম জলাবদ্ধতা এবং শুষ্ক মৌসুমে তীব্র পানির সংকট দেখা দিত।
প্রত্যাশিত সুফলসমূহ:
১. জলাবদ্ধতা নিরসন, বর্ষাকালে অতিরিক্ত বৃষ্টির পানি দ্রুত নেমে যেতে না পারায় শাহরাস্তি ও চাঁদপুর সদরের বিস্তীর্ণ ফসলি জমি তলিয়ে যেত। খাল দুটি পুনঃখনন করা হলে পানি নিষ্কাশন দ্রুত হবে এবং জলাবদ্ধতা থেকে মুক্তি মিলবে।
২. সেচ সুবিধার সম্প্রসারণ,শুষ্ক মৌসুমে যখন নদীতে পানি কমে যায়, তখন এই খালগুলো পানি ধরে রাখার আধার হিসেবে কাজ করবে। ফলে হাজার হাজার হেক্টর জমিতে স্বল্প খরচে সেচ দেওয়া সম্ভব হবে।
৩. মৎস্য চাষের সুযোগ,খালের পানি প্রবাহ সচল থাকলে স্থানীয়ভাবে দেশীয় প্রজাতির মাছের বংশবৃদ্ধি ঘটবে, যা গ্রামীণ জনগোষ্ঠীর আমিষের চাহিদা পূরণ করবে।
৪. পরিবেশের ভারসাম্য রক্ষা,খালের দুই পাড়ে বৃক্ষরোপণের যে উদ্যোগ প্রধানমন্ত্রী নিয়েছেন, তা অঞ্চলের জীববৈচিত্র্য রক্ষা এবং জলবায়ু পরিবর্তনের ঝুঁকি মোকাবিলায় দারুণ ভূমিকা রাখবে।
দুর্যোগ ব্যবস্থাপনা ও ত্রাণ মন্ত্রী আসাদুল হাবিব দুলু সংবাদমাধ্যমকে বলেন, শহীদ জিয়ার দর্শন ছিল উৎপাদনমুখী রাজনীতি। আজ আমাদের নেতা তারেক রহমান সেই দর্শনের বাস্তবায়ন করছেন মাটি ও মানুষের কাছে গিয়ে। এই খাল খনন কর্মসূচি দেশের খাদ্য নিরাপত্তা নিশ্চিতকরণে এক যুগান্তকারী পদক্ষেপ।
স্থানীয় সংসদ সদস্য মোমিনুল হক তাঁর প্রতিক্রিয়ায় বলেন, শাহরাস্তিবাসী আজ ধন্য। আমাদের খোর্দ্দ খালটি পুনরুজ্জীবিত করার মাধ্যমে প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমান প্রমাণ করলেন যে, বর্তমান সরকার গ্রামীণ ও প্রান্তিক মানুষের ভাগ্যোন্নয়নে কতটা আন্তরিক। আমরা এই প্রকল্পের সফল বাস্তবায়নে সর্বাত্মক কাজ করব।
খালের পাড়ে দাঁড়িয়ে থাকা ষাটোর্ধ্ব প্রবীণ কৃষক আলী আকবর আবেগপ্লুত হয়ে বলেন, আমি ছোটবেলায় প্রেসিডেন্ট জিয়াউর রহমানকে দেখছিলাম এই খালে কোদাল মারতে। আজ উনার পোলা তারেক রহমানরেও দেখলাম। আমরা কৃষকেরা পানির লাইগা খুব কষ্টে আছিলাম, এই খাল খনন হইলে আমাদের আর পানির অভাব থাহবো না।
চাঁদপুরে প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমানের এই সফর এবং একই দিনে দুটি বৃহৎ খালের পুনঃখনন কাজের উদ্বোধন কেবল কাঠামোগত উন্নয়নই নয়, এটি একটি ঐতিহাসিক ঐতিহ্যের পুনরুজ্জীবন। উৎপাদনমুখী অর্থনীতি ও স্বনির্ভর বাংলাদেশ গড়ার যে স্বপ্ন একদা শহীদ জিয়াউর রহমান দেখিয়েছিলেন, খোর্দ্দ খাল ও বিশ্ব খালের পুনঃখনন কাজের মাধ্যমে সেই স্বপ্নের বাস্তবায়ন বর্তমান প্রজন্মের হাত ধরে এগিয়ে চলেছে। চাঁদপুরের সাধারণ মানুষ ও কৃষক সমাজ এই উদ্যোগকে দীর্ঘকাল স্মরণ রাখবে এবং এর সুফল ভোগ করবে আগামী প্রজন্ম।
Leave a Reply