
আন্তর্জাতিক ডেস্ক:: “সোমবার ইসরায়েলের রামাত গান শহরে বিমান হামলার সাইরেন বেজে ওঠার পর এবং আসন্ন ক্ষেপণাস্ত্র হামলার সতর্কতা জারি হলে মানুষ আশ্রয়কেন্দ্রের দিকে ছুটে যাচ্ছে।
দীর্ঘ দুই মাসের একটি ভঙ্গুর যুদ্ধবিরতির পর আবারও রণক্ষেত্রে পরিণত হয়েছে মধ্যপ্রাচ্য। মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্পের সরাসরি নিষেধাজ্ঞা ও কঠোর হুঁশিয়ারি উপেক্ষা করে ইরান ও ইসরায়েল একে অপরের ওপর ব্যাপক বিমান ও ক্ষেপণাস্ত্র হামলা চালিয়েছে।
সোমবার ভোররাত থেকে শুরু হওয়া এই পাল্টাপাল্টি হামলায় দুই দেশের সামরিক স্থাপনার পাশাপাশি পেট্রোকেমিক্যাল কারখানাও ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে। এই আকস্মিক উত্তেজনা বিশ্ববাজারে জ্বালানি তেলের দাম প্রায় ৫ শতাংশ বাড়িয়ে দিয়েছে এবং ব্রেন্ট ক্রুডের মূল্য প্রতি ব্যারেল ৯৭ ডলার ছাড়িয়ে গেছে।
এদিকে, এই চরম উত্তেজনার মধ্যেই মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প উভয় পক্ষকে অবিলম্বে হামলা বন্ধ করার আহ্বান জানিয়েছেন। তিনি জোর দিয়ে বলেছেন, ওয়াশিংটন ও তেহরানের মধ্যকার শান্তি আলোচনা এই হামলার কারণে ব্যাহত হবে না, কারণ ভূরাজনীতির ‘চূড়ান্ত সিদ্ধান্ত, তিনিই নেন, ইসরায়েলি প্রধানমন্ত্রী বেনিয়ামিন নেতানিয়াহু নন।
চলতি বছরের ৮ এপ্রিল মার্কিন মধ্যস্থতায় ইরান ও ইসরায়েলের মধ্যে একটি সাময়িক যুদ্ধবিরতি চুক্তি স্বাক্ষরিত হয়েছিল। কিন্তু গত রবিবার (৭ জুন) ইসরায়েলি বিমানবাহিনী মার্কিন নিষেধাজ্ঞা উপেক্ষা করে লেবাননের রাজধানী বৈরুতের দক্ষিণাঞ্চলীয় দাহিয়াহ শহরতলিতে হিজবুল্লাহর শক্তিশালী ঘাঁটিতে তীব্র বিমান হামলা চালায়। ইসরায়েলের দাবি ছিল, হিজবুল্লাহর পক্ষ থেকে ইসরায়েলি ভূখণ্ডে রকেট হামলার জবাবেই তারা এই ব্যবস্থা নিয়েছে।
বৈরুতে এই হামলার পর পরই ইরান তীব্র প্রতিক্রিয়া দেখায়। রবিবার রাতে ইরানের ইসলামিক রেভল্যুশনারি গার্ড কর্পস (আইআরজিসি) ইসরায়েলের ভূখণ্ড লক্ষ্য করে দফায় দফায় ব্যালেস্টিক ক্ষেপণাস্ত্র নিক্ষেপ করে। ইসরায়েলি সামরিক বাহিনী জানায়, ইরান থেকে কয়েক দফায় ঝাঁকে ঝাঁকে ক্ষেপণাস্ত্র ছুড়ে মারা হয়েছে।
ইসরায়েলের রামাত গান, জেরুজালেম এবং উত্তরাঞ্চলীয় ও মধ্যাঞ্চলীয় শহরগুলোতে বিমান হামলার সাইরেন বেজে উঠলে লাখ লাখ মানুষ আতঙ্কে ভূগর্ভস্থ আশ্রয়কেন্দ্রে আশ্রয় নেয়। ওয়াশিংটনে নিযুক্ত ইসরায়েলের রাষ্ট্রদূত ইয়েচিয়েল লেইটার জানান, ইরান অন্তত ১১টি অত্যাধুনিক ব্যালেস্টিক ক্ষেপণাস্ত্র ছুড়েছে। তেহরানের দাবি, তারা ইসরায়েলের নেভাতিম এবং তেল নোফ বিমান ঘাঁটি লক্ষ্য করে এই হামলা চালিয়েছে।
ইরানি ক্ষেপণাস্ত্র হামলার জবাবে সোমবার ভোরে ইসরায়েলি বিমানবাহিনী ইরানের মধ্য ও পশ্চিমাঞ্চলের একাধিক সামরিক লক্ষ্যবস্তুতে বড় ধরনের বিমান হামলা চালায়। ইসরায়েলের ডিফেন্স ফোর্সেস (আইডিএফ) নিশ্চিত করেছে যে, তারা ইরানের বিমান প্রতিরক্ষা ব্যবস্থা ভেঙে দিতে এবং ক্ষেপণাস্ত্র উৎক্ষেপণ কেন্দ্রগুলো ধ্বংস করতে এই অভিযান পরিচালনা করেছে।
ইরানের রাষ্ট্রীয় সংবাদমাধ্যম ‘ফার্স’ এবং ‘মেহর’ নিউজ এজেন্সি জানিয়েছে, তেহরান, ইসফাহান, কারাজ ও তাবরিজ শহরে বিকট বিস্ফোরণের শব্দ শোনা গেছে। সবচেয়ে বড় আঘাতটি এসেছে ইরানের দক্ষিণ-পশ্চিমাঞ্চলীয় খুজেস্তান প্রদেশের মাহশাহর শহরের একটি গুরুত্বপূর্ণ পেট্রোকেলেমিক কমপ্লেক্সে। যুদ্ধবিরতির পর এই প্রথম ইরানের কোনো জ্বালানি ও শিল্প অবকাঠামোতে ইসরায়েল সরাসরি আঘাত হানল।
আইআরজিসি জানিয়েছে, ইসরায়েলি যুদ্ধবিমান থেকে দূরপাল্লার ব্যালেস্টিক ক্ষেপণাস্ত্র ব্যবহার করে এই হামলা চালানো হয়েছে। হামলার পর তেহরানের ইমাম খোমেনী আন্তর্জাতিক বিমানবন্দরসহ আশপাশের আকাশসীমা বন্ধ করে দেওয়া হয়।
এর জবাবে আইআরজিসি তাৎক্ষণিকভাবে ইসরায়েলের হাইফা বন্দরে অবস্থিত একটি সমমানের পেট্রোকেমিক্যাল প্ল্যান্ট লক্ষ্য করে পাল্টা ক্ষেপণাস্ত্র নিক্ষেপ করে এবং হুঁশিয়ারি দেয় যে, ইরানের জ্বালানি খাতে আর কোনো আঘাত আসলে বিশ্ব অর্থনীতিকে তার চড়া মূল্য দিতে হবে, যার দায় থাকবে যুক্তরাষ্ট্রের।
এই সংঘাতের জলঘোলা করতে নতুন মাত্রা যোগ করেছে ইয়েমেনের ইরানপন্থী হুতি বিদ্রোহীরা। যুদ্ধবিরতির পর এই প্রথম হুতিরা ইসরায়েল অভিমুখে দূরপাল্লার ক্ষেপণাস্ত্র নিক্ষেপ করেছে। একই সঙ্গে তারা লোহিত সাগরে ইসরায়েলি ও মার্কিন জাহাজ চলাচল সম্পূর্ণ বন্ধ করে দেওয়ার অঙ্গীকার পুনর্ব্যক্ত করেছে।
ইরানের সর্বোচ্চ নেতার এক শীর্ষ উপদেষ্টার বরাত দিয়ে ইরানি সংবাদমাধ্যম জানিয়েছে, ইসরায়েল যদি হামলা বন্ধ না করে, তবে ইরান কেবল হরমুজ প্রণালীই নয়, বরং লোহিত সাগরের প্রবেশদ্বার বাবেল মান্দেব প্রণালীও পুরোপুরি অবরুদ্ধ করে দেবে। সুয়েজ খালের সংযোগকারী এই আন্তর্জাতিক নৌপথ বন্ধ হয়ে গেলে বিশ্ব বাণিজ্যে বিপর্যয় নেমে আসতে পারে বলে আশঙ্কা করছেন অর্থনীতিবিদরা।
এই রক্তক্ষয়ী সংঘাত এমন এক সময়ে ঘটল যখন মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প তেহরানের সাথে একটি বড় ধরনের শান্তি চুক্তি চূড়ান্ত করার দ্বারপ্রান্তে রয়েছেন বলে দাবি করছিলেন। নিউ জার্সির বেডমিনস্টারে নিজের গলফ ক্লাবে অবস্থানরত ট্রাম্প রোববার ইসরায়েলি প্রধানমন্ত্রী বেনিয়ামিন নেতানিয়াহুর সাথে প্রায় আধঘণ্টা ফোনে কথা বলেন এবং তেহরানের ওপর পাল্টা হামলা না চালাতে অত্যন্ত কড়া ভাষায় সতর্ক করেন। মার্কিন কর্মকর্তাদের সূত্রে জানা গেছে, ট্রাম্প নেতানিয়াহুকে বলেছিলেন, ‘আমরা একটি ভালো চুক্তির খুব কাছাকাছি আছি, তাই এখনই কোনো হামলা করবেন না।
তবে ইসরায়েল সেই অনুরোধ উপেক্ষা করে ইরানের অভ্যন্তরে হামলা চালালে ট্রাম্প ক্ষোভ প্রকাশ করেন। ফক্স নিউজ ও ফাইন্যান্সিয়াল টাইমসকে দেওয়া সাক্ষাৎকারে ট্রাম্প বলেন, এই হামলার কারণে ইরানের সাথে চলমান মার্কিন শান্তি আলোচনায় কোনো প্রভাব পড়বে না। চুক্তির শর্ত কী হবে তা আমিই নির্ধারণ করছি। আমিই চূড়ান্ত সিদ্ধান্ত নিই । নেতানিয়াহু এখানে কোনো সিদ্ধান্ত নেওয়ার মালিক নন। তাকে আমার শর্ত মানতেই হবে।
ট্রাম্প আরও যোগ করেন যে, লেবাননে ইসরায়েলের সাম্প্রতিক হামলা মার্কিন প্রশাসনের সাথে সমন্বয় করে করা হয়নি এবং তিনি এই বিষয়ে মোটেও সন্তুষ্ট নন। এনবিসি নিউজের ‘মিট দ্য প্রেস’ অনুষ্ঠানে ট্রাম্প বলেন, তেহরানের সাথে পারমাণবিক বিস্তার রোধ ও নিষেধাজ্ঞা প্রত্যাহারের বিষয়ে একটি চুক্তি প্রায় চূড়ান্ত, আর ইরান যদি শান্তি না চায় তবে তাদের ‘ধ্বংস করে দেওয়া হবে।
হঠাৎ করেই মধ্যপ্রাচ্যের দুই চিরবৈরী দেশের এই প্রত্যক্ষ যুদ্ধাবস্থায় বিশ্বজুড়ে উদ্বেগ ছড়িয়ে পড়েছে। ভারতের তেল ও প্রাকৃতিক গ্যাস মন্ত্রী হারদীপ সিং পুরী এক সাক্ষাৎকারে গভীর উদ্বেগ প্রকাশ করে বলেন, উপসাগরীয় অঞ্চলের এই সংকট যদি অন্য থিয়েটারে বা অঞ্চলে ছড়িয়ে পড়ে, তবে তা গোটা বিশ্বের জ্বালানি নিরাপত্তার জন্য মারাত্মক ক্ষতিকর হবে।
কূটনৈতিক সূত্রে জানা গেছে, লড়াই শুরু হলেও পর্দার আড়ালে পাকিস্তানের মধ্যস্থতায় যুক্তরাষ্ট্র ও ইরানের মধ্যে কূটনৈতিক বার্তা আদান-প্রদান অব্যাহত রয়েছে। ইরানের পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের মুখপাত্র ইসমাইল বাঘাই নিশ্চিত করেছেন যে, যুদ্ধাবস্থার মধ্যেও ইসলামাবাদের মাধ্যমে আলোচনা সচল রাখা হয়েছে।
বিশ্লেষকদের মতে, বেনিয়ামিন নেতানিয়াহু ডোনাল্ড ট্রাম্পের চাপ উপেক্ষা করে হিজবুল্লাহ ও ইরানকে দুর্বল করার যে কৌশল নিয়েছেন, তা ট্রাম্পের নিজস্ব কূটনৈতিক এজেন্ডার মুখোমুখি দাঁড়িয়ে গেছে। মার্কিন প্রেসিডেন্ট যেখানে মধ্যপ্রাচ্য থেকে মার্কিন সম্পৃক্ততা কমিয়ে একটি বড় চুক্তি করতে চান, সেখানে ইসরায়েলের এই আগ্রাসী নীতি চুক্তিটিকে খাদের কিনারায় দাঁড় করিয়ে দিয়েছে।
আগামী কয়েক দিন আন্তর্জাতিক কূটনীতির জন্য অত্যন্ত সংকটপূর্ণ বলে মনে করা হচ্ছে, কারণ এই সংঘাত থামানো না গেলে তা একটি পূর্ণাঙ্গ আঞ্চলিক মহাযুদ্ধে রূপ নিতে পারে।
Leave a Reply