
আন্তর্জাতিক ডেস্ক:: মধ্যপ্রাচ্যের আকাশ এখন বারুদের ধোঁয়ায় আচ্ছন্ন। গত কয়েক ঘণ্টার ঘটনাবলি প্রমাণ করছে, ইরান এবং যুক্তরাষ্ট্র-ইসরায়েল জোট এখন এক পূর্ণাঙ্গ ও প্রলয়ংকরী যুদ্ধের চূড়ায় দাঁড়িয়ে।
মঙ্গলবার ইরান যে ভয়াবহ বিমান হামলার সম্মুখীন হয়েছে, তাকে পেন্টাগন এবং তেহরানের সাধারণ নাগরিকরা এই যুদ্ধের ইতিহাসে ‘সবচেয়ে তীব্র’ বলে বর্ণনা করেছেন। পাল্টা আঘাত হিসেবে ইরানও কাতার, ইরাক, বাহরাইন ও সংযুক্ত আরব আমিরাতের মার্কিন ঘাঁটিগুলো লক্ষ্য করে নজিরবিহীন ক্ষেপণাস্ত্র ও ড্রোন হামলা চালিয়েছে।
মঙ্গলবার দিনভর ইরানের রাজধানী তেহরানসহ গুরুত্বপূর্ণ শহরগুলোতে বৃষ্টির মতো বোমা বর্ষণ করেছে যুক্তরাষ্ট্র ও ইসরায়েলি বাহিনী। তেহরানের আজাদি টাওয়ারের আশপাশ থেকে শুরু করে সামরিক স্থাপনা সবখানেই এখন ধ্বংসস্তূপ।
পেন্টাগনের ব্রিফিংয়ে মার্কিন প্রতিরক্ষামন্ত্রী পিট হেগসেথ সাফ জানিয়েছেন, এটিই ছিল তাদের সবচেয়ে বড় অপারেশন। তিনি বলেন, “আজ আমরা সবচেয়ে বেশি সংখ্যক যুদ্ধবিমান এবং বোমারু বিমান ব্যবহার করেছি। আমাদের গোয়েন্দা তথ্য ছিল নিখুঁত, যার ফলে হামলাগুলো হয়েছে আগের চেয়ে অনেক বেশি বিধ্বংসী।’
তেহরানের একজন বাসিন্দা রয়টার্সকে দেওয়া সাক্ষাৎকারে এই বিভীষিকাকে বর্ণনা করেছেন ‘নরক’ হিসেবে। তাঁর ভাষ্যমতে, মনে হচ্ছিল পুরো তেহরান জুড়েই তারা বোমা ফেলছিল, কোথাও মাথা গোঁজার ঠাঁই ছিল না।
হামলার তীব্রতা যখন তুঙ্গে, তখন মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প তাঁর সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যম ‘ট্রুথ সোশ্যাল’-এ এক চাঞ্চল্যকর তথ্য শেয়ার করেন। তিনি দাবি করেন, গত কয়েক ঘণ্টার অভিযানে মার্কিন বাহিনী ইরানের ১০টি ‘নিষ্ক্রিয় মাইন’ বসানো জাহাজকে সম্পূর্ণ ধ্বংস করে দিয়েছে। যদিও এই হামলার সঠিক অবস্থান তিনি উল্লেখ করেননি, তবে ধারণা করা হচ্ছে হরমুজ প্রণালী বা এর আশপাশেই এই অভিযান চালানো হয়েছে।
ইরানের ইসলামি বিপ্লবী গার্ড কোর (আইআরজিসি) চুপ করে বসে থাকেনি। তারা গতকাল থেকে আজ বুধবার ভোর পর্যন্ত মধ্যপ্রাচ্যের বিভিন্ন দেশে ছড়িয়ে থাকা মার্কিন সামরিক স্থাপনায় বড় ধরনের হামলা চালিয়েছে।
আল-উদেইদ বিমানঘাঁটিতে ক্ষেপণাস্ত্র হামলা। কুর্দিস্তানের আল-হারির ঘাঁটিতে প্রলয়ংকরী আঘাত। আল-ধাফরা বিমানঘাঁটি এবং জুফায়ের নৌঘাঁটিতে মার্কিন সেনাদের ওপর ড্রোন হামলা।
বুধবার ভোরে ইরান থেকে সরাসরি ইসরায়েলের কেন্দ্রস্থল লক্ষ্য করে একঝাঁক ক্ষেপণাস্ত্র ছোড়া হয়েছে। তেল আবিবসহ বিভিন্ন শহরে সাইরেন বাজার সাথে সাথে সাধারণ মানুষ আশ্রয়কেন্দ্রে ছুটে যায়।
হোয়াইট হাউস আবারও কঠোর হুঁশিয়ারি দিয়ে বলেছে, হরমুজ প্রণালী দিয়ে জ্বালানি সরবরাহ বন্ধ করার যেকোনো ইরানি প্রচেষ্টাকে সামরিকভাবে চূর্ণ করা হবে। এই যুদ্ধের ফলে বিশ্বের এক-পঞ্চমাংশ তেল ও গ্যাসের সরবরাহ এখন কার্যত বন্ধ। পরিস্থিতি মোকাবিলায় মার্কিন নৌবাহিনী ঘোষণা করেছে, তারা চাইলে যেকোনো বাণিজ্যিক ট্যাংকারকে পাহারায় দিয়ে নিরাপদে পার করে দেবে।
ইরানের সাথে সংহতি জানিয়ে হিজবুল্লাহ যখন ইসরায়েলে হামলা বাড়িয়েছে, ঠিক তখনই বৈরুতে ব্যাপক বিমান হামলা চালিয়েছে ইসরায়েলি বাহিনী। হিজবুল্লাহর সামরিক শক্তি নির্মূল করাই এই অভিযানের লক্ষ্য বলে দাবি করেছে তেল আবিব।
১০ মার্চের এই নজিরবিহীন হামলা-পাল্টা হামলা বিশ্বকে এক দীর্ঘস্থায়ী অর্থনৈতিক ও মানবিক সংকটের দিকে ঠেলে দিচ্ছে। বিশেষ করে তেহরানের কেন্দ্রস্থলে হামলা এবং মার্কিন নৌঘাঁটিতে ড্রোন আঘাত হানার ঘটনা সংঘাতকে আঞ্চলিক গণ্ডি ছাড়িয়ে বৈশ্বিক রূপ দেওয়ার ইঙ্গিত দিচ্ছে।
মধ্যপ্রাচ্যের এই আগুনের লেলিহান শিখা আজ বুধবার সকালেও কমেনি। ইরান ও যুক্তরাষ্ট্রের এই সরাসরি যুদ্ধ বিশ্ব অর্থনীতিতে তেলের দামে যে বিস্ফোরণ ঘটাবে, তার প্রভাব থেকে বাংলাদেশসহ কোনো দেশই মুক্ত থাকবে না।
Leave a Reply