
আন্তর্জাতিক ডেস্ক:: ইরানের তেহরান শহরের প্রাণকেন্দ্রে অবস্থিত ‘জিহাদ চৌরাস্তা’। চারদিকে যুদ্ধের দামামা, ধ্বংসস্তূপ আর অস্থিরতা। কিন্তু এর মাঝেই এক অনন্য প্রতিরোধের গল্প রচনা করছেন পারস্যের সাধারণ নাগরিকরা। বসন্তের মৃদু বৃষ্টির মাঝে মেহের ম্যাগাজিনের এক প্রতিবেদনে উঠে এসেছে ফারিদে নামের এক তরুণীর অদম্য দেশপ্রেমের আখ্যান।
শহরের এই মোড়টির নাম আগে এমন ছিল না। গত ২৯ মার্চ থেকে স্থানীয় মানুষজন এক প্রতীকী উদ্যোগ গ্রহণ করেন। তারা বিশাল একটি জাতীয় পতাকা তৈরি করে শপথ নেন পরিস্থিতি যাই হোক, এই পতাকা তারা কখনও মাটিতে পড়তে দেবেন না। সেই থেকে পালাক্রমে নাগরিকরা এই পতাকা উঁচিয়ে ধরে রাখছেন। ৬০ দিনেরও বেশি সময় ধরে চলা এই অবিরাম প্রতিরোধের ছাপ প্রতিটি পথচারীর মুখে স্পষ্ট।
তেহরানের ফেরদৌসি স্কয়ার পার হওয়ার সময় চোখে পড়ে যুদ্ধের ক্ষত। যেসব অট্টালিকা একসময় গর্বের সাথে দাঁড়িয়ে ছিল, আজ সেগুলো কঙ্কালসার। কিন্তু এই শূন্যতার মাঝেও মানুষের দ্রুত পদচারণা আর সন্ধ্যার হালকা বাতাস যেন নতুন দিনের আশার বার্তা দিচ্ছে। ধ্বংসস্তূপের ধুলো ছাপিয়ে দূরে তাকালে দেখা যায় সেই ত্রিবর্ণ পতাকা, যা এক তরুণী পরম মমতায় ও শক্ত হাতে ধরে রেখেছেন।
পতাকা হাতে দাঁড়িয়ে থাকা সেই তরুণীর নাম ফারিদে। যুদ্ধের ক্লান্তিতে যখন শহরবাসী বিপর্যস্ত, তখন তার চোখেমুখে দেখা গেল বসন্তের প্রথম দিনের মতো কোমল ও প্রাণবন্ত হাসি। কেন তিনি এই কঠিন সময়ে এভাবে দাঁড়িয়ে আছেন? এমন প্রশ্নে ফারিদে কোনো দ্বিধা ছাড়াই উত্তর দেন, দেশের প্রতি ভালোবাসাই আমাকে এখানে টেনে এনেছে। আমার কাছে এটি এক ধরনের জিহাদ শত্রুর হাত থেকে জন্মভূমিকে রক্ষা করার ক্ষুদ্র এক প্রচেষ্টা।
তার কণ্ঠস্বরে ছিল এমন এক দৃঢ়তা, যা চারপাশের গাড়ির হর্ন আর যুদ্ধের কোলাহলকেও ছাপিয়ে যাচ্ছিল। ফারিদের মতো সাধারণ মানুষের এই অটল বিশ্বাসই প্রমাণ করে যে, দেশপ্রেম কোনো অস্ত্র বা রাজনৈতিক ভাষণে নয়, বরং সাধারণ মানুষের হৃদয়েই সবচেয়ে বেশি জীবন্ত থাকে।
ফারিদের এই অটল ভঙ্গি মনে করিয়ে দেয় ইরানের প্রখ্যাত বিপ্লবী নেতা শহীদ বেহেশতির সেই ঐতিহাসিক কথা, আমরা সমস্যার বোঝায় কখনো নত হব না। আমরা ইতিহাসে চিরকাল সোজা দাঁড়িয়ে থাকা মানুষ হয়ে থাকব। কেবল তখনই আমরা দাঁড়িয়ে থাকি না, যখন আমরা নিহত বা আহত হই; নতুবা কোনো শক্তিই আমাদের পিঠ বাঁকাতে পারে না।
ফারিদের হাত থেকে ফারিদের হাত এভাবেই বদলে যাচ্ছে পতাকা ধরার মানুষ। তেহরানের আকাশজুড়ে উড়তে থাকা সেই পতাকা কেবল একটি কাপড় নয়, বরং এক জাতির মাথা নত না করার দালিলিক প্রমাণ। যুদ্ধের এই অস্থির সময়েও ফারিদারা ভবিষ্যতের স্বপ্ন বোনেন এবং বিশ্বের সামনে ঘোষণা করেন পারস্যের এই পতাকা কখনও ধুলোয় লুটাবে না।
Leave a Reply