
বিশেষ প্রতিবেদক:: একটি ন্যায়ভিত্তিক, জবাবদিহিমূলক এবং আধুনিক রাষ্ট্রব্যবস্থা গড়ে তোলার জন্য স্বচ্ছ ও জনবান্ধব ভূমি ব্যবস্থাপনার কোনো বিকল্প নেই বলে মন্তব্য করেছেন প্রধানমন্ত্রী ও বাংলাদেশ জাতীয়তাবাদী দল (বিএনপি)-র চেয়ারম্যান তারেক রহমান।
মঙ্গলবার সকালে রাজধানীর তেজগাঁও এলাকার ‘ভূমি ভবন’ প্রাঙ্গণে তিন দিনব্যাপী দেশব্যাপী ভূমি সেবা সপ্তাহ ও মেলা-২০২৬, এর আনুষ্ঠানিক উদ্বোধনকালে তিনি এ কথা বলেন।
প্রধানমন্ত্রী স্পষ্ট ভাষায় স্মরণ করিয়ে দেন যে, জনগণকে সেবা দেওয়া কোনো দয়া বা অনুকম্পার বিষয় নয়; বরং নাগরিক সেবা নিশ্চিত করা সরকারের মৌলিক দায়িত্ব। একটি দুর্নীতিমুক্ত, হয়রানিমুক্ত, প্রযুক্তি-নির্ভর এবং নাগরিক-বান্ধব ভূমি ব্যবস্থাপনা গড়ে তোলাই তাঁর সরকারের প্রধান লক্ষ্য, যা দেশের টেকসই উন্নয়নকে আরও ত্বরান্বিত করবে।
উদ্বোধনী বক্তৃতায় প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমান সময়ের সাথে সাথে ভূমির মালিকানা ও ব্যবস্থাপনার জটিলতার একটি ঐতিহাসিক চিত্র তুলে ধরেন। তিনি বলেন, আজ থেকে হয়তো ১০০ বছর আগে একটি নির্দিষ্ট ভূখণ্ডের বা জমির মালিক ছিলেন মাত্র একজন ব্যক্তি। কিন্তু সময়ের আবর্তনে, উত্তরাধিকার সূত্রে এবং জনসংখ্যার বৃদ্ধির ফলে আজ সেই একই জমির অংশীদার বা মালিকের সংখ্যা দাঁড়িয়েছে একশ বা তারও বেশি।
মালিকানা ও সহ-মালিকানার এই জ্যামিতিক বৃদ্ধির কারণে ভূমি কর্মকর্তাদের দায়িত্ব ও জবাবদিহিতা বহুলাংশে বৃদ্ধি পেয়েছে বলে তিনি উল্লেখ করেন। শত শত অংশীদারের সঠিক রেকর্ড বজায় রাখা, সীমানা নির্ধারণ করা এবং স্বত্ব রক্ষা করার কাজটি আগের চেয়ে অনেক বেশি জটিল ও সংবেদনশীল হয়ে উঠেছে। এই প্রেক্ষাপটে কর্মকর্তাদের আরও বেশি দায়িত্বশীল এবং নির্ভুলভাবে কাজ করার আহ্বান জানান তিনি।
প্রধানমন্ত্রী তাঁর বক্তব্যে সাধারণ মানুষের ভূমি সংক্রান্ত অভিজ্ঞতার কথা উল্লেখ করেন। তিনি বলেন, বাংলাদেশের সাধারণ ভূমির মালিকরা কম-বেশি খতিয়ান, দাগ, পরচা, নামজারি (মিউটেশন), মৌজা, দলিল, ভূমি উন্নয়ন কর (খাজনা) এবং সিএস (CS), আরএস (RS), ডিএস (DS) রেকর্ডের মতো জটিল পরিভাষাগুলোর সাথে পরিচিত।
তিনি বলেন, অতীতের সনাতন পদ্ধতিতে এই রেকর্ডগুলো হালনাগাদ রাখতে বা সামান্য তথ্যের প্রয়োজনেও সাধারণ মানুষকে দিনের পর দিন ভূমি অফিসে দৌড়াতে হতো। এতে সাধারণ নাগরিকদের চরম ভোগান্তি পোহাতে হতো এবং তাদের সময় ও অর্থের অপচয় হতো।
তিনি বলেন, এই ভোগান্তির অবসান ঘটাতেই তাঁর সরকার তথ্যপ্রযুক্তির সর্বোচ্চ ব্যবহার নিশ্চিত করে ভূমি খাতকে ঢেলে সাজানোর উদ্যোগ নিয়েছে। প্রযুক্তির ছোঁয়ায় এখন আর মানুষকে সনাতন খাতার পাতা উল্টে বছরের পর বছর অপেক্ষা করতে হবে না।
বর্তমান সরকারের মূল দর্শন হলো ‘ডিজিটাল ও স্মার্ট ভূমি সেবা’। প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমান বলেন, প্রযুক্তিগত অগ্রগতির সাথে সাথে দেশের ভূমি ব্যবস্থাপনাও আধুনিক রূপ নিয়েছে। আধুনিক ও তথ্যপ্রযুক্তি-ভিত্তিক ভূমি ব্যবস্থাপনা চালু হওয়ার ফলে জমিজমা সংক্রান্ত দীর্ঘদিনের জটিল দেওয়ানি ও ফৌজদারি বিরোধগুলো নিষ্পত্তি করা এখন অনেক সহজ হয়ে গেছে।
অনলাইন ডাটাবেজ এবং ডিজিটাল রেকর্ডিংয়ের মাধ্যমে এখন যেকোনো জমির প্রকৃত মালিকানা, পূর্ববর্তী রেকর্ড এবং খতিয়ান মুহূর্তের মধ্যেই যাচাই করা সম্ভব। ফলে জালিয়াতি, ভুয়া দলিল তৈরি এবং একই জমি একাধিক ব্যক্তির কাছে বিক্রি করার মতো অপরাধমূলক প্রবণতা একেবারেই কমে আসবে বলে তিনি আশাবাদ ব্যক্ত করেন।
ভূমি ব্যবস্থাপনায় অনলাইন ও ই-সার্ভিস নিশ্চিত করার সুদূরপ্রসারী সুফলের কথা উল্লেখ করে প্রধানমন্ত্রী বলেন, যখন একজন নাগরিক ঘরে বসেই ইন্টারনেটের মাধ্যমে তাঁর নামজারি (মিউটেশন) করতে পারবেন, খতিয়ানের নকল তুলতে পারবেন কিংবা ভূমি উন্নয়ন কর পরিশোধ করতে পারবেন, তখন স্বাভাবিকভাবেই ভূমি অফিসগুলোতে সশরীরে যাওয়ার ভোগান্তি কমে যাবে।
তিনি দৃঢ়তার সাথে বলেন, ভূমি সেবাকে শতভাগ অনলাইন বা ই-সেবায় রূপান্তরের মাধ্যমে ভূমি অফিসগুলো থেকে মধ্যস্বত্বভোগী বা ‘দালাল’ চক্রের প্রভাব সম্পূর্ণ নির্মূল করা সম্ভব হবে। মানুষ যখন সরাসরি রাষ্ট্রীয় পোর্টাল বা অ্যাপের মাধ্যমে সেবা পাবেন, তখন তৃতীয় কোনো পক্ষের ওপর নির্ভর করার সুযোগ থাকবে না। এটি মাঠ পর্যায়ের ভূমি অফিসগুলোকে দুর্নীতিমুক্ত করতে সবচেয়ে বড় হাতিয়ার হিসেবে কাজ করবে।
একটি দেশের সামগ্রিক অর্থনৈতিক উন্নয়ন এবং বিনিয়োগ আকর্ষণের জন্য ভূমির সঠিক ব্যবস্থাপনা অত্যন্ত জরুরি। প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমান তাঁর দীর্ঘ বক্তব্যে উল্লেখ করেন যে, বিদেশী বিনিয়োগকারী বা দেশীয় শিল্পোদ্যোক্তারা যখন কোনো প্রকল্প হাতে নেন, তখন তাদের প্রথম প্রয়োজন হয় নিষ্কণ্টক জমি।
ভূমি রেকর্ড যদি আধুনিক এবং প্রশ্নাতীত না হয়, তবে শিল্পায়ন বাধাগ্রস্ত হয় এবং বিনিয়োগকারীরা নিরুৎসাহিত হন। তাই একটি আধুনিক রাষ্ট্র গঠনে এবং টেকসই উন্নয়ন লক্ষ্যমাত্রা (এসডিজি) অর্জনে ভূমি সংস্কারকে অন্যতম প্রধান চালিকাশক্তি হিসেবে বিবেচনা করছে বর্তমান বিএনপি সরকার।
রাজধানীর তেজগাঁওয়ে শুরু হওয়া ৩ দিনব্যাপী এই জাতীয় ভূমি মেলা নিয়ে প্রধানমন্ত্রী বলেন, এই মেলার মূল উদ্দেশ্য কেবল সেবা দেওয়া নয়, বরং আধুনিক ভূমি ব্যবস্থাপনা সম্পর্কে জনগণের মধ্যে ব্যাপক সচেতনতা তৈরি করা। নাগরিক হিসেবে নিজের জমির রেকর্ড কীভাবে ধরে রাখতে হয়, কখন কর দিতে হয় এবং ডিজিটাল সেবাগুলো কীভাবে গ্রহণ করতে হয়- তা সাধারণ মানুষকে শেখানো এই মেলার অন্যতম লক্ষ্য।
তিনি দেশের সর্বস্তরের মানুষকে এই মেলায় আসার এবং সরকারের আধুনিক ডিজিটালাইজড সেবাগুলোর সাথে পরিচিত হওয়ার আহ্বান জানান। একই সাথে মাঠ পর্যায়ের কর্মকর্তা-কর্মচারীদের উদ্দেশ্যে তিনি বলেন, মেলায় আগত প্রতিটি নাগরিক যেন বিনাবাধায় এবং হাসিমুখে তাঁদের কাঙ্ক্ষিত সেবা ও পরামর্শ পান, তা নিশ্চিত করতে হবে।
উদ্বোধনী অনুষ্ঠানের সমাপনী বক্তব্যে প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমান একটি কল্যাণমুখী রাষ্ট্র গঠনের অঙ্গীকার পুনর্ব্যক্ত করেন। তিনি বলেন, আমরা এমন একটি বাংলাদেশ গড়তে চাই যেখানে একজন কৃষক থেকে শুরু করে প্রবাসী রেমিট্যান্স যোদ্ধা—কারো জমি যেন অবৈধভাবে দখল না হয়, কাউকে যেন নিজের হকের পাওনার জন্য টেবিল থেকে টেবিলে ঘুরতে না হয়।
তিনি আশাবাদ ব্যক্ত করেন যে, ‘ভূমি সেবা সপ্তাহ ও মেলা-২০২৬’ দেশের ভূমি খাতে এক যুগান্তকারী পরিবর্তনের সূচনা করবে। প্রযুক্তি, সততা ও জবাবদিহিতাকে মূলধন করে দেশের প্রতিটি ভূমি অফিসকে জনগণের সেবাকেন্দ্রে পরিণত করার জন্য তিনি সংশ্লিষ্ট মন্ত্রণালয়, কর্মকর্তা এবং জনগণের সম্মিলিত সহযোগিতা কামনা করেন। ফিতা কেটে এবং বেলুন উড়িয়ে তিনি এই ঐতিহাসিক মেলার আনুষ্ঠানিক উদ্বোধন ঘোষণা করেন।
Leave a Reply