
নিজস্ব প্রতিবেদক:: ইরান-ইসরাইল যুদ্ধের প্রভাবে উত্তাল মধ্যপ্রাচ্যের বর্তমান পরিস্থিতিতে প্রবাসী বাংলাদেশিদের নিরাপত্তা এবং দেশের অভ্যন্তরীণ দুর্যোগ মোকাবিলায় বিশেষ তৎপরতা শুরু করেছেন প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমান।
রোববার সকাল ৯টা ১০ মিনিটে সচিবালয়ে নিজ দপ্তরে উপস্থিত হয়ে তিনি সরকারের নীতি-নির্ধারণী পর্যায়ের একাধিক গুরুত্বপূর্ণ বৈঠক করেন। মধ্যপ্রাচ্যে আটকে পড়া প্রবাসীদের উদ্ধার, বিমানবন্দরে যাত্রী ভোগান্তি লাঘব এবং ভূমিকম্প পরবর্তী দুর্যোগ মোকাবিলায় এক লাখ স্বেচ্ছাসেবক তৈরির মতো যুগান্তকারী নির্দেশনা দিয়েছেন তিনি।
সকালে সচিবালয়ে প্রধানমন্ত্রীর সাথে সাক্ষাৎ করেন পররাষ্ট্রমন্ত্রী ড. খলিলুর রহমান এবং প্রধানমন্ত্রীর পররাষ্ট্র বিষয়ক উপদেষ্টা হুমায়ুন কবির। বৈঠকের মূল আলোচনার কেন্দ্রবিন্দু ছিল মধ্যপ্রাচ্যের সংঘাতপূর্ণ অঞ্চলে অবস্থানরত বাংলাদেশিদের বর্তমান অবস্থা।
প্রধানমন্ত্রী নির্দেশ দিয়েছেন যে, ইরানসহ মধ্যপ্রাচ্যের প্রতিটি দেশে থাকা বাংলাদেশিদের নিরাপত্তা নিশ্চিত করতে হবে এবং দূতাবাসগুলোর মাধ্যমে তাদের সাথে সার্বক্ষণিক যোগাযোগ বজায় রাখতে হবে।
যুদ্ধের কারণে অনেক আন্তর্জাতিক ফ্লাইট বাতিল হওয়ায় যে অচলাবস্থা তৈরি হয়েছে, তা নিরসনে বিকল্প ব্যবস্থা গ্রহণের বিষয়ে আলোচনা হয়েছে।
প্রধানমন্ত্রী পররাষ্ট্রমন্ত্রীকে স্পষ্ট বার্তা দিয়েছেন যে, কোনো বাংলাদেশি যেন বিদেশের মাটিতে অসহায় বোধ না করেন, সে জন্য প্রয়োজনীয় সব ধরনের কূটনৈতিক ও আর্থিক সহায়তা প্রস্তুত রাখতে হবে।
মধ্যপ্রাচ্যের আকাশপথ বন্ধ হয়ে যাওয়ায় হযরত শাহজালাল আন্তর্জাতিক বিমানবন্দরে কয়েক হাজার যাত্রী আটকা পড়েছেন। প্রধানমন্ত্রী এই বিষয়টি নিয়ে গভীর উদ্বেগ প্রকাশ করেছেন এবং নিজে সার্বক্ষণিক তদারকি করছেন।
প্রধানমন্ত্রীর অতিরিক্ত প্রেস সচিব আতিকুর রহমান রুমন সাংবাদিকদের জানান, প্রধানমন্ত্রীর নির্দেশ অনুযায়ী বিমান মন্ত্রী ও প্রতিমন্ত্রী বিমানবন্দরে সশরীরে উপস্থিত থেকে কার্যক্রম পরিচালনা করছেন। বিশেষ করে আটকে পড়া যাত্রীদের আবাসন, খাবার এবং বিকল্প ফ্লাইটের বিষয়ে প্রবাসী কল্যাণ মন্ত্রীও নিরবচ্ছিন্নভাবে কাজ করে যাচ্ছেন। প্রধানমন্ত্রী সাফ জানিয়ে দিয়েছেন, বিমানবন্দরে সাধারণ যাত্রীদের যেন কোনোভাবেই হয়রানির শিকার হতে না হয়।
সচিবালয়ে প্রধানমন্ত্রীর দিনের কর্মসূচির অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ অংশ ছিল দুর্যোগ ব্যবস্থাপনা ও ত্রাণ মন্ত্রী আসাদুল হাবিব দুলুর সাথে বৈঠক। মধ্যপ্রাচ্যের সংঘাতের পাশাপাশি দেশের অভ্যন্তরীণ নিরাপত্তা এবং প্রাকৃতিক দুর্যোগ, বিশেষ করে ভূমিকম্পের ঝুঁকি নিয়ে বিস্তারিত আলোচনা হয়।
সাক্ষাৎ শেষে ত্রাণ মন্ত্রী আসাদুল হাবিব দুলু জানান, প্রধানমন্ত্রী ভূমিকম্প পরবর্তী পরিস্থিতি মোকাবিলায় একটি শক্তিশালী কর্মপরিকল্পনা তৈরির নির্দেশ দিয়েছেন। তিনি বলেন, প্রধানমন্ত্রী ঢাকায় অতি দ্রুত এক লাখ প্রশিক্ষণপ্রাপ্ত স্বেচ্ছাসেবক তৈরি করার নির্দেশ দিয়েছেন। এই স্বেচ্ছাসেবক বাহিনী যেকোনো বড় ধরনের প্রাকৃতিক দুর্যোগে উদ্ধারকাজ ও জরুরি সেবায় সরাসরি অংশগ্রহণ করবে।
সরকার মনে করছে, নগরায়নের ফলে ঢাকা শহর যেভাবে জনবহুল হয়ে উঠেছে, তাতে ভূমিকম্পের মতো দুর্যোগে জনগণের জানমাল রক্ষায় এই বিশাল স্বেচ্ছাসেবক বাহিনী রক্ষাকবচ হিসেবে কাজ করবে।
রবিবার সকাল থেকেই প্রধানমন্ত্রীর এই বহুমুখী তৎপরতা প্রশাসনের কর্মকর্তাদের মধ্যে নতুন উদ্দীপনা তৈরি করেছে। একদিকে বিদেশের মাটিতে থাকা রেমিট্যান্স যোদ্ধাদের নিরাপত্তা নিশ্চিত করা, অন্যদিকে দেশের ভেতরে সম্ভাব্য দুর্যোগ মোকাবিলায় আগাম প্রস্তুতি নেওয়া—সব মিলিয়ে সরকার একটি ভারসাম্যপূর্ণ কৌশল অবলম্বন করছে।
সংশ্লিষ্ট বিশ্লেষকরা মনে করছেন, মধ্যপ্রাচ্যের এই অস্থিতিশীল সময়ে প্রধানমন্ত্রীর সরাসরি সচিবালয়ে বসে দাপ্তরিক কাজ পরিচালনা এবং সংশ্লিষ্ট মন্ত্রীদের সরাসরি নির্দেশনা দেওয়া সংকট মোকাবিলায় বিশেষ ভূমিকা রাখবে।
ইরানের চলমান সংকট কেবল ভূ-রাজনৈতিক বিষয় নয়, এটি হাজার হাজার বাংলাদেশি পরিবারের উদ্বেগের কারণ। প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমানের আজকের এই তৎপরতা প্রমাণ করে যে, সরকার প্রবাসীদের জীবন ও জীবিকার বিষয়ে আপসহীন। একইসাথে দেশের ভেতরে প্রাকৃতিক দুর্যোগ মোকাবিলায় এক লাখ স্বেচ্ছাসেবক তৈরির সাহসী সিদ্ধান্ত বাংলাদেশকে একটি দুর্যোগ-সহনশীল রাষ্ট্র হিসেবে গড়ে তোলার পথে বড় পদক্ষেপ।
Leave a Reply