
এম জালাল উদ্দীন, পাইকগাছা (খুলনা):: খুলনার পাইকগাছার হাড়িয়া আবাদ গ্রামজুড়ে এখন শোনা যাচ্ছে নানা প্রজাতির পাখির কিচিরমিচির। গাছে গাছে পাখির অবাধ বিচরণ আর কলতানে মুখর হয়ে উঠেছে পুরো এলাকা। প্রকৃতির এই মনোমুগ্ধকর দৃশ্য স্থানীয় বাসিন্দাদের পাশাপাশি দর্শনার্থীদেরও আকৃষ্ট করছে।
উপজেলার জলাভূমি অধ্যুষিত লতা ইউনিয়নের হাড়িয়া আবাদ এলাকায় রয়েছে অসংখ্য খাল, বিল ও জলাশয়। পাশ দিয়ে প্রবাহিত হয়েছে নদী। লবণাক্ত মাটি ও পানির কারণে এখানে সুন্দরবনের বাইন, কেওড়াসহ বিভিন্ন প্রজাতির গাছ স্বাভাবিকভাবে জন্মেছে। এসব গাছকে নিরাপদ আবাসস্থল হিসেবে বেছে নিয়েছে নানা জাতের পাখি।
সরেজমিনে দেখা যায়, স্থানীয় বাসিন্দা নারাণ রায়ের বাড়ির আঙিনার বাইন গাছে পানকৌড়ি, বক, হাঁসসহ বিভিন্ন প্রজাতির পাখি বাসা বেঁধেছে। এছাড়া পাশের রশিদ মিয়ার বাড়ির তেঁতুল, নারকেল ও অন্যান্য গাছেও পাখিদের নিরাপদ বিচরণ লক্ষ্য করা যায়। সকাল থেকে সন্ধ্যা পর্যন্ত পাখিদের অবাধ আনাগোনায় এলাকাটি যেন এক প্রাকৃতিক অভয়ারণ্যে পরিণত হয়েছে।
পাখিদের কলতান, খুনসুটি আর দলবদ্ধভাবে উড়ে বেড়ানোর দৃশ্য সহজেই মুগ্ধ করে প্রকৃতিপ্রেমীদের। জলাশয়ের এক প্রান্ত থেকে অন্য প্রান্তে খাদ্যের সন্ধানে তাদের উড়ে চলা এবং সন্ধ্যায় আবার দলবদ্ধভাবে ফিরে আসার দৃশ্য এলাকাবাসীর নিত্যদিনের আনন্দের উৎস হয়ে উঠেছে।
স্থানীয়রা জানান, ভোর হলে পাখিগুলো আশপাশের নদী, খাল ও জলাশয়ে খাদ্যের সন্ধানে ছড়িয়ে পড়ে। দিন শেষে তারা আবার নিজেদের নিরাপদ আশ্রয়ে ফিরে আসে। দীর্ঘদিন ধরে এ দৃশ্য দেখে আসলেও এর প্রতি মানুষের আগ্রহ ও ভালোবাসা কমেনি।
এলাকার সচেতন মহলের দাবি, পাখি শিকার, হত্যা কিংবা ধরার বিরুদ্ধে তারা সামাজিকভাবে কঠোর অবস্থান নিয়েছেন। ফলে পাখিগুলো এখানে নির্বিঘ্নে বসবাস করতে পারছে এবং নিরাপদ আশ্রয় খুঁজে পেয়েছে।
স্থানীয়দের মতে, গ্রীষ্ম মৌসুমে উপজেলার অন্যান্য এলাকায় অতিথি পাখির উপস্থিতি তুলনামূলকভাবে কমে গেলেও হাড়িয়া আবাদে এখনও উল্লেখযোগ্য সংখ্যক পাখির বিচরণ রয়েছে। ফলে প্রতিদিনই পাখিদের কলকাকলিতে মুখর থাকে পুরো গ্রাম।
সংশ্লিষ্টরা জানান, শীত মৌসুমে এ এলাকায় পাখির সংখ্যা আরও বেড়ে যায়। তখন সরালি হাঁস, চখাচখি, বালিহাঁস, গার্গেনি হাঁস, সুচিপুচ্ছ হাঁস, গাঙচিল, জলপিপি ও কাদাখোঁচাসহ বিভিন্ন প্রজাতির দেশি-বিদেশি অতিথি পাখির আগমন ঘটে। শীতকালে পুরো এলাকা পরিণত হয় পাখিদের নিরাপদ আবাসস্থল ও বিচরণভূমিতে।
প্রকৃতিপ্রেমীদের মতে, জীববৈচিত্র্য সংরক্ষণ এবং পরিবেশের ভারসাম্য রক্ষায় পাখিদের ভূমিকা অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। তাই তাদের নিরাপদ আবাসস্থল নিশ্চিত করতে জনসচেতনতা বৃদ্ধি এবং কার্যকর সংরক্ষণ উদ্যোগ গ্রহণ জরুরি।
এ বিষয়ে স্থানীয় পরিবেশবাদী সংগঠন ‘বনবিবি’র সভাপতি, সাংবাদিক ও কলামিস্ট প্রকাশ ঘোষ বিধান বলেন, পাখি সংরক্ষণে আমরা দীর্ঘদিন ধরে কাজ করে যাচ্ছি। এ লক্ষ্যে উপজেলার বিভিন্ন এলাকায় গাছে গাছে পাখির বাসা স্থাপন করা হয়েছে। আমরা চাই, মানুষের পাশাপাশি পাখিরাও এ অঞ্চলে নিরাপদ আবাসস্থল পেয়ে স্বাভাবিকভাবে বেঁচে থাকুক।
তিনি আরও বলেন, পাখি ও প্রকৃতি রক্ষায় স্থানীয় জনগণের সচেতনতাই হতে পারে জীববৈচিত্র্য সংরক্ষণের সবচেয়ে কার্যকর উপায়।
Leave a Reply