
ডেস্ক:: ছাত্র-জনতার অভ্যুত্থান পরবর্তী অন্তর্বর্তীকালীন সরকারের প্রধান উপদেষ্টা প্রফেসর ড. মুহাম্মদ ইউনূসের কাছে চূড়ান্ত প্রতিবেদন জমা দিয়েছে গুম সংক্রান্ত কমিশন অব ইনকোয়ারি।
রোববার বিকেলে রাষ্ট্রীয় অতিথি ভবন যমুনায় কমিশনের সদস্যরা এই প্রতিবেদন হস্তান্তর করেন।
প্রতিবেদন জমা দেওয়ার সময় উপস্থিত ছিলেন কমিশনের সভাপতি বিচারপতি মইনুল ইসলাম চৌধুরী, সদস্য বিচারপতি মো. ফরিদ আহমেদ শিবলী, নূর খান লিটন, নাবিলা ইদ্রিস ও সাজ্জাদ হোসেন। এছাড়াও উপস্থিত ছিলেন উপদেষ্টা আদিলুর রহমান খান ও প্রধান উপদেষ্টার মুখ্য সচিব সিরাজউদ্দিন মিয়া।
কমিশন জানায়, তদন্ত চলাকালে মোট ১ হাজার ৯১৩টি অভিযোগ জমা পড়ে। এর মধ্যে যাচাই-বাছাই শেষে ১ হাজার ৫৬৯টি অভিযোগ সংজ্ঞা অনুযায়ী বলপূর্বক গুম হিসেবে বিবেচিত হয়েছে।
এর মধ্যে ২৮৭টি অভিযোগ ‘মিসিং অ্যান্ড ডেড’ ক্যাটাগরিতে অন্তর্ভুক্ত করা হয়েছে। গুমের শিকার ব্যক্তিদের অনেকের সঙ্গে যোগাযোগ করলে তাঁদের মাধ্যমে আরও ভিক্টিমের খোঁজ পাওয়া যায় বলে জানান কমিশন সদস্য নাবিলা ইদ্রিস। তিনি আশঙ্কা প্রকাশ করেন যে, বাংলাদেশে গুমের প্রকৃত সংখ্যা চার থেকে ছয় হাজার হতে পারে।
বলপূর্বক গুমের নেপথ্যে মূলত রাজনৈতিক উদ্দেশ্য ছিল বলে নিশ্চিত করেছেন কমিশন সদস্যরা। প্রাপ্ত তথ্য পর্যালোচনায় দেখা গেছে, এটি একটি ‘পলিটিক্যালি মোটিভেটেড ক্রাইম’ বা রাজনৈতিক উদ্দেশ্যপ্রণোদিত অপরাধ।
প্রতিবেদনে উল্লেখ করা হয়, গুমের শিকার ব্যক্তিদের মধ্যে যারা জীবিত ফিরেছেন তাঁদের ৭৫ শতাংশ জামায়াত-শিবিরের নেতাকর্মী এবং ২২ শতাংশ বিএনপি ও অঙ্গসংগঠনের নেতাকর্মী। অন্যদিকে যারা এখনো নিখোঁজ রয়েছেন, তাঁদের মধ্যে ৬৮ শতাংশ বিএনপি ও অঙ্গসংগঠনের এবং ২২ শতাংশ জামায়াত-শিবিরের নেতাকর্মী।
তদন্তে হাই প্রোফাইল গুমের ঘটনায় তৎকালীন প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা, তাঁর প্রতিরক্ষা বিষয়ক উপদেষ্টা মেজর জেনারেল (অব.) তারিক আহমেদ সিদ্দিক এবং তৎকালীন স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী আসাদুজ্জামান খানের সরাসরি সম্পৃক্ততার প্রমাণ পাওয়া গেছে। উল্লেখযোগ্য মামলার মধ্যে বিএনপি নেতা ইলিয়াস আলী, চৌধুরী আলম, সালাহউদ্দিন আহমদ, হুম্মাম কাদের চৌধুরী, জামায়াত নেতা সাবেক ব্রিগেডিয়ার জেনারেল আবদুল্লাহিল আমান আযমী ও ব্যারিস্টার মীর আহমদ বিন কাসেমের নাম উঠে এসেছে।
কমিশন জানায়, শেখ হাসিনা নিজে অনেকগুলো গুমের ক্ষেত্রে সরাসরি নির্দেশদাতা ছিলেন। এমনকি আইনি প্রক্রিয়া ছাড়াই গুমের শিকার ব্যক্তিদের গোপনে প্রতিবেশী দেশ ভারতে হস্তান্তরের (রেন্ডিশন) প্রমাণও পাওয়া গেছে।
অক্লান্ত পরিশ্রমের জন্য কমিশনের সদস্যদের ধন্যবাদ জানিয়ে প্রধান উপদেষ্টা প্রফেসর ড. মুহাম্মদ ইউনূস বলেন, এটি একটি ঐতিহাসিক কাজ। এই নৃশংসতাকে এক কথায় ‘পৈশাচিক’ বলা যায়। বাংলাদেশের প্রতিষ্ঠানগুলোকে দুমড়ে-মুচড়ে দিয়ে গণতন্ত্রের লেবাস পরে মানুষের ওপর যে পৈশাচিক আচরণ করা হয়েছে, এই রিপোর্ট তার ডকুমেন্টেশন।
তিনি আরও বলেন, যারা এই ভয়ংকর অপরাধ করেছে তারা আমাদের মতোই মানুষ এবং এখনো সমাজে স্বাভাবিক জীবনযাপন করছে। জাতি হিসেবে এই নৃসংসতা থেকে আমাদের চিরতরে বের হয়ে আসতে হবে।
প্রধান উপদেষ্টা আয়নাঘরের পাশাপাশি বিচারবহির্ভূত হত্যাকাণ্ড ও লাশ গুমের স্থানগুলো ‘ম্যাপিং’ করার নির্দেশনা দেন। কমিশন জানায়, তদন্ত অনুযায়ী বরিশালের বলেশ্বর নদীতে সবচেয়ে বেশি লাশ গুমের ঘটনা ঘটেছে। এছাড়াও বুড়িগঙ্গা নদী ও মুন্সিগঞ্জেও লাশ ফেলে দেওয়ার প্রমাণ মিলেছে।
প্রধান উপদেষ্টা এই রিপোর্টগুলো সহজ ভাষায় মানুষের কাছে পৌঁছে দেওয়ার আহ্বান জানান এবং জাতীয় মানবাধিকার কমিশন পুনর্গঠন করে ভিক্টিমদের সুরক্ষা নিশ্চিতের বিষয়ে প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা নেওয়ার আশ্বাস দেন।
Leave a Reply